৬ কোম্পানিকে কাঁচা চামড়া ও ওয়েট ব্লু রপ্তানির অনুমতি দিচ্ছে সরকার

গত কয়েক বছর ধরে ঈদ-উল আযহার সময় কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি না হওয়া এবং ট্যানারিগুলোতে বিপুল পরিমাণ চামড়া মজুদ পড়ে থাকায় এবছর কোরবানীর আগে কেইস টু কেইস ভিত্তিতে কাঁচা চামড়া ও ওয়েট ব্লু রপ্তানি চালুর ঘোষণা দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো কাঁচা চামড়া রপ্তানির অনুমতি দিতে যাচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে রপ্তানির অনুমতি পাচ্ছে ওয়েট ব্লুও। ছয়টি প্রতিষ্ঠান সাত কোটি বর্গফুট কাঁচা চামড়া ও ওয়েট ব্লু রপ্তানির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে, যার মূল্যমান প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার।

এসব আবেদনের প্রেক্ষিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক সভায় শর্তসাপেক্ষে চামড়া রপ্তানির অনুমতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

চীন, জাপান, ইটালিসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত বিভিন্ন দেশ এবং পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর কাছ থেকে কাঁচা চামড়া ও ওয়েট ব্লুর রপ্তানি আদেশ এসেছে বলে কোম্পানিগুলো বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে। ভারত থেকে রপ্তানি অর্ডার আসলেও চোরাচালানের বিষয়টি মাথায় রেখে দেশটিতে চামড়া রপ্তানিতে অনাগ্রহ আছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের।

রপ্তানি শুরুর পর অভ্যন্তরীণ বাজারে এর প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করে সরকার রপ্তানির অনুমতি অব্যাহত রাখা, না রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

সাধারণত একটি বড় আকারের গরুর চামড়া ৩৫-৪০ বর্গফুট, মাঝারি আকারের গরুর চামড়া ২৫-৩০ বর্গফুট এবং ছোট আকারের গরুর চামড়া ১৬-২০ বর্গফুটের হয়। সাত কোটি বর্গফুট চামড়া বড় আকারের প্রায় ২০ লাখ গরুর চামড়ার সমান।

ট্যানারি শিল্প রক্ষায় স্বাধীনতার পর থেকেই কাঁচা চামড়ার রপ্তানি নিষিদ্ধ করা আছে। ১৯৮৯ সালের পর থেকে বন্ধ ওয়েট ব্লুর রপ্তানিও।

গত কয়েক বছর ধরে ঈদ-উল আযহার সময় কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি না হওয়া এবং ট্যানারিগুলোতে বিপুল পরিমাণ চামড়া মজুদ পড়ে থাকায় এবছর কোরবানীর আগে কেইস টু কেইস ভিত্তিতে কাঁচা চামড়া ও ওয়েট ব্লু রপ্তানি চালুর ঘোষণা দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

এরপর থেকেই চামড়া রপ্তানির সম্ভাবনা নিয়ে তৎপরতা শুরু হয়। রপ্তানি অর্ডারও আসতে শুরু করে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বেশ কিছু কোম্পানি কাঁচা চামড়া ও ওয়েট ব্লু রপ্তানির অনুমতি চেয়ে আবেদন করলেও মন্ত্রণালয় ছয়টি কোম্পানির আবেদন বিবেচনা করছে। এসব কোম্পানিকে রপ্তানির অনুমতি দিতে গত ২৪ নভেম্বর সভা করেছে মন্ত্রণালয়। সভায় শর্তসাপেক্ষে রপ্তানির অনুমতি দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রপ্তানি) মো. ওবায়দুল আজম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ‘শর্ত মেনে কাঁচা চামড়া ও ওয়েট ব্লু রপ্তানি নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি, সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পরের বৈঠকে কোম্পানিগুলোকে রপ্তানির চূড়ান্ত অনুমতি দেয়া হবে।’

ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস এন্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) প্রতিনিধিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভায় সিদ্ধান্ত হয়, কাঁচা চামড়া ও ওয়েট ব্লু রপ্তানির ক্ষেত্রে কঠোরভাবে আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনভাবেই দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট না হয়।

মান নিশ্চিত করার জন্য ট্যানার্স এসোসিয়েশন ও বিএফএলএলএফইএ- এর সঙ্গে রপ্তানিকারকদের আলোচনা করতে হবে। তবে তাদেরকে এ দু’টি সংগঠনের সদস্য হওয়া বাধ্যতামুলক নয়।

এলসি বা টিটির মাধ্যমে অগ্রিম পেমেন্ট নিয়ে রপ্তানি করতে হবে। রপ্তানিকারকের কাছে ট্যানারি, আড়ৎদার বা সংশ্লিষ্ট অন্য কারো বকেয়া পাওনা আছে কিনা, রপ্তানির অনুমতি দেয়ার আগে তা খতিয়ে দেখবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বকেয়া পরিশোধ না করলে রপ্তানির অনুমতি নাও দেয়া হতে পারে।

ইতালি থেকে ৩.৭০ কোটি বর্গফুট ওয়েট ব্লুর অর্ডার পাওয়ার তথ্য জানিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে রপ্তানির অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছে লেদার ইন্ডাস্ট্রিজ অব বাংলাদেশ লিমিটেড। আগামী তিন বছরে এই পরিমাণ ওয়েট ব্লু রপ্তানি করতে চায় কোম্পানিটি।

কালাম ব্রাদার্স ট্যানারি লিমিটেড চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভূক্ত দেশগুলো থেকে ১.৫৫ কোটি বর্গফুট ওয়েট ব্লু রপ্তানির অর্ডার পেয়েছে। তারাও আগামী তিন বছরের মধ্যে তা রপ্তানি করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে। চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে তিন বছরে ১.৩০ কোটি বর্গফুট ওয়েট ব্লু রপ্তানির অনুমতি চেয়েছে কাদের লেদার কমপ্লেক্স।

কালাম ব্রাদার্স ট্যানারির ডিরেক্টর সাজেদুল খায়ের দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ‘চীন, ভারত, জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভূক্ত তিনটি দেশ আমাদের কোম্পানি থেকে ওয়েট ব্লু আমদানির আগ্রহ দেখিয়েছে। রপ্তানির অনুমতি চেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছি। আশা করি, মন্ত্রণালয় থেকে খুব শিগগিরই অনুমতি পাব।’

তিনি বলেন, ‘কোভিড সংক্রমণে বিপর্যস্ত দেশগুলো থেকেও ক্রেতারা আমাদের কাছ থেকে ওয়েট ব্লু আমদানির আগ্রহ দেখাচ্ছে। এটা বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের জন্য খুবই ইতিবাচক ঘটনা।’

বাংলাদেশ ট্যানার্স এসোসিয়েশনের সদস্য একেএস ইনভেস্টমেন্ট চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি ব্যবসায় জড়িত। প্রতিষ্ঠানটি পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো থেকে ২০ লাখ বর্গফুট ওয়েট ব্লু রপ্তানির আদেশ পেয়েছে। রপ্তানির অনুমতি চেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে করা আবেদনের সঙ্গে রপ্তানি অর্ডারের কপি জমা দিয়েছে কোম্পানিটি।

কোরবানির ঈদে রুমি এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া কিনে লবন দিয়ে গুদামে ফেলে রেখেছে। ক্রেতার অভাবে এগুলো বিক্রি করা যাচ্ছে না। এজন্য ৫০ হাজার পিস কাঁচা চামড়া রপ্তানির অনুমতি চেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

৩০ বছর ধরে চামড়া ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বাদল ট্রেডার্স হাইড এন্ড স্কিন মার্চেন্ট ও কমিশন এজেন্ট লবণযুক্ত কাঁচা চামড়া ও ওয়েট ব্লু চীন ও ভারতে রপ্তানির অনুমতি চেয়েছে। তবে কি পরিমাণ রপ্তানি অর্ডার প্রতিষ্ঠানটির কাছে আছে, আবেদনে তা উল্লেখ করা হয়নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here