২০৩০ পর্যন্ত এলডিসির সব সুবিধা রাখার আহ্বান বাংলাদেশের

স্টাফ রিপোর্টার : উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন পর্যন্ত স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) সব সুবিধাই বাংলাদেশের জন্য অব্যাহত রাখার দাবি জানানো হয়েছে।

জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) চতুর্থ ‘উন্নয়নের জন্য অর্থায়ন’ (এফএফডি) ফোরামের অধিবেশনে একটি যৌথ সেমিনারে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ দাবি তুলে ধরা হয়।

কেপ ভার্দের অভিজ্ঞতার আলোকে জাতিসংঘ ঘোষিত ১৫ বছর মেয়াদি এসডিজি বাস্তবায়নের বছর অর্থাৎ ২০৩০ সাল পর্যন্ত এলডিসি হিসেবে প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রাখার দাবি জানায় বাংলাদেশ। উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার পরও এসব সুযোগ-সুবিধার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে বিকল্প কর্মপন্থা তৈরির কথাও জানানো হয়।

বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘ প্লাজার মিলেনিয়াম হিল্টনে ‘এলডিসি থেকে উত্তরণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাঠামো ও এসডিজি বাস্তবায়ন’ শীর্ষক এ সেমিনার যৌথভাবে আয়োজন করে বাংলাদেশ, কেপ ভার্দের স্থায়ী মিশন, অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) এবং ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আঙ্কটাড)।

২০২১ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হওয়ার কথা রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে বাংলাদেশও শুল্কমুক্ত রফতানি সুবিধা, কম সুদে ঋণসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা হারাবে।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মনোয়ার আহমেদের সঞ্চালনায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন। প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন জাতিসংঘে নিযুক্ত কেপ ভার্দের স্থায়ী প্রতিনিধি হোসে লুইস ফিয়ালহো রোচা, আঙ্কটাডের মহাসচিব মুখিসা কিটুয়ি, ওইসিডির পরিচালক জর্জ মরিরা দি সিলভা ও জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির প্রধান রোনাল্ড মোলেরাস।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটলে বিশ্বব্যাংকের মতো বহুজাতিক সংস্থাগুলো থেকে কম সুদে ঋণের পরিমাণ কমে যাবে। উন্নত দেশ থেকে সরকারিভাবে দেয়া সহযোগিতা (ওডিএ) কমে যাবে। এতে বাংলাদেশের জন্য এসডিজি বাস্তবায়ন কঠিন হবে। যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগের কারণে প্রতি বছর বাংলাদেশের জিডিপির ২ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে।

সেমিনার শেষে নজিবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ উন্নত বিশ্বে আমরা এখন যেসব বাণিজ্য সুবিধা পাই, উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হলে সেসব হারাব। এসব সুবিধা যাতে অব্যাহত থাকে, সে অনুরোধ করেছি। তারা বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন। সুবিধাগুলো অব্যাহত রাখতে বিকল্প নীতিকৌশল প্রণয়নের বিষয়েও চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। এ সময় দৃষ্টান্ত হিসেবে এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার পর কেপ ভার্দের অবস্থার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

সেমিনারে বলা হয়, উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার পর বাংলাদেশের পণ্য রফতানিতে বড় আঘাত আসবে। জিএসপি সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মাধ্যমে রফতানিতে বিশেষ ভর্তুকি পাওয়ার সুযোগ আর থাকবে না। উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নাম লেখার সঙ্গে সঙ্গে রফতানি পণ্যে অতিরিক্ত ৬ দশমিক ৭ শতাংশ শুল্ক বসবে। এতে বছরে রফতানি কমবে ২৭০ কোটি ডলার। স্বল্পোন্নত দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ এখন জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন করে রফতানি করে। উন্নয়নশীল দেশ হলে এ সুবিধা থাকবে না।

ইআরডি সচিব মনোয়ার আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, কেপ ভার্দেকে এখন কেউ সহযোগিতা করছে না। সে পরিস্থিতি এড়াতে বিশ্বব্যাপী আমরা জনমত গড়ে তুলছি। প্রয়োজনে এসব সুবিধা অব্যাহত রাখতে বিকল্প নীতিকৌশল প্রণয়ন করার অনুরোধ করেছি।

সেমিনারে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নিউইয়র্কে নিযুক্ত বাংলাদেশের ইকোনমিক মিনিস্টার ইকবাল আবদুল্লাহ হারুন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের যুগ্ম সচিব আনোয়ার হোসেনসহ অন্যরা।

সেমিনারে কেপ ভার্দের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত হোসে লুইস ফিয়ালহো রোচা তার দেশের উত্তরণ সময়কালের এবং উত্তরণ-পরবর্তী বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। জাতিসংঘ, উন্নয়ন অংশীদার ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সমন্বয়ে উত্তরণ সময়ের জন্য একটি ‘ট্রানজিশন সাপোর্ট টিম’ প্রণয়নের কথা তুলে ধরেন তিনি।

আঙ্কটাডের মহাসচিব মুখিসা কিটুয়ি উত্তরণ টেকসই করতে ডিজিটাল ইকোনমি সৃষ্টির কথা উল্লেখ করেন।

জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির প্রধান রোনাল্ড মোলেরাস উত্তরণের পথে থাকা দেশগুলোর জন্য একটি কনসালটেটিভ মেকানিজম তৈরি করার কথা উল্লেখ করেন। উত্তরণকালীন সুবিধাদি আরো বাড়ানোর বিষয়ে আসন্ন ডব্লিউটিওর সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এলডিসিগুলোর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন সহায়তা ক্রমান্বয়ে কমে যাচ্ছে উল্লেখ করে ওডিএ প্রদানকারী দেশগুলোর সংগঠন ওইসিডির পরিচালক জর্জ মরিরা ডি সিলভা বলেন, উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে এ ধারার পরিবর্তন দরকার এবং উত্তরণশীল দেশগুলোকে অবশ্যই সহযোগিতা প্রদান অব্যাহত রাখতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here