রিজার্ভের অর্থ ব্যবহারে সতর্ক থাকার তাগিদ

ভোগ্যপণ্য ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানি বেড়ে যাওয়ায় হঠাৎ বেড়ে গেছে বাংলাদেশের আমদানি খরচ। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সব মিলিয়ে আমদানি খরচ হয়েছে ৭২৩ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৫ শতাংশ বেশি। গত ডিসেম্বরেও আমদানি খরচ ছিল ৫৩৮ কোটি ডলার। আর ১০ মার্চে বৈদেশিক মুদ্রায় রিজার্ভ ছিল ৪ হাজার ২৯৭ কোটি ডলার। জানুয়ারির মতো আমদানি ব্যয় বাড়তে থাকলে বর্তমানে মজুত বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে ছয় মাসের আমদানি খরচও মেটানো যাবে না।

এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা মজুতের অর্থ নিয়ে দেশে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। তহবিলটির নাম দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিল (বিআইডিএফ)। আপাতত বিদ্যুৎ খাতে ও বন্দর উন্নয়নে ব্যবহৃত হবে এই তহবিলের অর্থ। তহবিলটির বার্ষিক বিনিয়োগ লক্ষ্যমাত্রা ২০০ কোটি ডলার।

নতুন গঠিত তহবিলটি থেকে প্রথম ঋণ পাচ্ছে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ। ঋণের পরিমাণ ৫ হাজার ৪১৭ কোটি টাকার সমান, যা দেওয়া হবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একক মুদ্রা ইউরোয়। এতে রিজার্ভ থেকে তিন বছরে ৫২ কোটি ৪০ লাখ ইউরো বা ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ নিয়ে অর্থ বিভাগ, পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়েছে।

রিজার্ভের টাকায় উন্নয়নকাজে ব্যবহারের সরকারি উদ্যোগ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদেরা। কেউ বলছেন, রিজার্ভ দুঃসময়ের সঙ্গী। সচেতনভাবে এর ব্যবহার করতে হবে। আবার কেউ বলছেন, ছোট আকারের এমন তহবিলে বিদেশি অংশগ্রহণ থাকলে ভালো সুফল পাওয়া যেত। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, আগে বিমান কিনতে একই প্রক্রিয়া মেনে সোনালী ব্যাংককে ডলার দেওয়া হয়েছিল। এবারও সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। ছয় মাসের আমদানি খরচের সমপরিমাণ মজুত না থাকলে রিজার্ভ থেকে কোনো ডলার দেওয়া হবে না।

জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন  বলেন, ‘রিজার্ভ রাখা হয় ঝুঁকি মোকাবিলার অংশ হিসেবে। বলা হচ্ছে, ছয় মাসের আমদানি ব্যয়ের অতিরিক্ত অর্থ বিনিয়োগ করা হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো সামনের দিনে কী পরিস্থিতি দাঁড়াবে। আমদানি খরচ কত বাড়বে, সেই ধারণা কোথায় মিলবে। তাই ভবিষ্যৎ আমদানি খরচ অতি সতর্কতার সঙ্গে হিসাব করা উচিত। আমার হিসাবে প্রতি মাসে ৭০০ কোটি ডলারের বেশি আমদানি খরচ ধরা উচিত। এতে ছয় মাসের আমদানি খরচের চেয়ে রিজার্ভ বেশি নেই। এ ছাড়া ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ছে, ভোক্তা চাহিদা বাড়লে আমদানিও বাড়বে। তাই রিজার্ভ ব্যবহারের আগে আরেকটু ভাবা দরকার ছিল।জাহিদ হোসেন আরও বলেন, বিদেশি ঋণ নিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে তাতে স্বচ্ছতা আরও বাড়ত। আর বিপদের সময় আমদানি দায় মেটাতে ঋণ নিলে এখনকার চেয়ে খরচও বেশি পড়বে, শর্তও বেশি থাকবে।

অর্থ বিভাগ–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, পায়রা বন্দর তিন বছরে ৫ হাজার ৪১৭ কোটি টাকার সমান ঋণ পাবে। রিজার্ভ থেকে এ অর্থ নিয়ে ১০ বছর মেয়াদে তা বন্দরকে দেবে সোনালী ব্যাংক। মোট ১১টি কিস্তিতে দেওয়া হবে এ অর্থ। প্রথম কিস্তির অর্থ দেওয়া হবে আগামী মে মাসে। এই ঋণের বিপরীতে সুদ দিতে হবে ২ শতাংশ। এর মধ্যে ১ শতাংশ পাবে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ১ শতাংশ পাবে সোনালী ব্যাংক। ২০৩১ থেকে ২০৪১ সালের মধ্যে ঋণের অর্থ পরিশোধ করবে পায়রা বন্দর। প্রতিবছর চার কিস্তি হিসেবে মোট ৪০ কিস্তিতে ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, রিজার্ভের অর্থ ব্যবহারের এটা খুব ছোট এক উদ্যোগ। সরকার নিজে ঋণ না নিয়ে সোনালী ব্যাংককে দিয়ে এ ঋণ নিল। রিজার্ভ থেকে যে অর্থ নেওয়া হচ্ছে, এটা খুবই কম। এতে কোনো সমস্যা হবে না।

জানা গেছে, ২০১৩ সালে পটুয়াখালী জেলার রাবনাবাদ চ্যানেলে পায়রা বন্দর নামে দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দরের উদ্বোধন করা হয়। ২০৫০ সাল নাগাদ দেশে কনটেইনারবাহী কার্গো পরিবহনের চাহিদা হবে বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি। আর খননের মাধ্যমে রাবনাবাদ চ্যানেলের গভীরতা ১০ দশমিক ৫ মিটারে উন্নীত করা সম্ভব। মূলত বিদেশ থেকে আনা ব্যয়বহুল ড্রেজার দিয়ে এই চ্যানেল খনন করতে হবে। এ জন্যই বিদেশি মুদ্রার প্রয়োজন পড়বে। তাই রিজার্ভ থেকে অর্থ নিচ্ছে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ।

বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, খননকাজ শেষে বিপুলসংখ্যক বিদেশি জাহাজ এই বন্দরে আসবে। এতে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে নতুন মাত্রা সংযোজিত হবে। তা ছাড়া দেশের দক্ষিণাঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানেও ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here