মানসিক হাসপাতাল শুধু নামে

দেশের প্রায় ১৭ শতাংশ মানুষের কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে। কিন্তু এর চিকিৎসায় পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল নেই। রয়েছে অবকাঠামো সংকট। সরকারি বিশেষায়িত হাসপাতাল আছে দুটি, ঢাকা ও পাবনায়। সেখানেও নানা সমস্যা। বেসরকারি খাতের অবস্থা আরও শোচনীয়। তারা সরকারের কোনো শর্ত মানে না। মারধর তাদের অন্যতম চিকিৎসা পদ্ধতি। আবার অনেক ক্ষেত্রে মানসিক চিকিৎসা ও মাদকাসক্তির চিকিৎসাকে তারা এক করে ফেলেছে।

ঢাকার এমনই একটি বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে গত সোমবার মারধরে মারা গেছেন পুলিশের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার আনিসুল করিম। এই ঘটনার পর বেসরকারি ক্লিনিকে মানসিক চিকিৎসার দুর্দশার চিত্রটি ব্যাপকভাবে সামনে আসে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ঢাকায় সরকার অনুমোদিত বেসরকারি মানসিক হাসপাতাল আছে ১৫টি। প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতালই সরকারের দেওয়া লাইসেন্সের শর্তও মানছে না। শয্যাসংখ্যা অনুপাতে যে সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী থাকার কথা, সেটা নেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অন্য হাসপাতালই বাইরের চিকিৎসকদের (অন কল) ওপর নির্ভরশীল। এক-দুজন মেডিকেল অফিসার মূলত হাসপাতাল চালান।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বেশির ভাগ হাসপাতালে মানসিক রোগীদের চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নেই। রোগীদের চিকিৎসার নামে মারধরের অভিযোগ তো রয়েছেই। বিশেষজ্ঞরা বলেন, শুধু ওষুধ নয়, এসব রোগীর নিয়মিত মানসম্পন্ন কাউন্সেলিং দেওয়ার দরকার হয়। তা দেওয়ার মতো জনবলও নেই।

গত বছর নভেম্বরে প্রকাশিত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮-১৯ অনুযায়ী, দেশের দুই কোটির বেশি মানুষ বিভিন্ন ধরনের মানসিক রোগে আক্রান্ত। শতকরা হিসেবে তা ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। ইনস্টিটিউটের হিসাবে, দেশের সাড়ে ১৬ কোটির বেশি মানুষের জন্য এই মুহূর্তে মানসিক রোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন ২৭০ জন। আর কাউন্সেলিংয়ের জন্য সাইকোলজিস্ট রয়েছেন মাত্র ২৫০ জন।

প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত জনবল কম থাকার সুযোগ নিচ্ছে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল। এদের ওপর প্রয়োজনীয় নজরদারি নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে তাঁরা নিয়মিত নজরদারি করতে পারছেন না।

সরকার অনুমোদিত মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রের বাইরে রাজধানীতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুমোদনপ্রাপ্ত মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্র আছে ১০৫টি। এ ধরনের অনেক প্রতিষ্ঠানও মানসিক রোগীর চিকিৎসা দিচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে চিকিৎসার নামে রোগীকে মারধর করার অভিযোগও বেশি।

পুলিশ কর্মকর্তা আনিসুল করিম যে হাসপাতালে মারা যান, সেটিও এমন একটি চিকিৎসাকেন্দ্র। মাইন্ড অ্যান্ড সাইকিয়াট্রিক অ্যান্ড ডি-অ্যাডিকশন হসপিটাল নামের এই প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো অনুমোদন নেই। মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের লাইসেন্স নিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসা দিয়ে আসছিল। অভিযোগ আছে, আনিসুলকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট থেকে ওই বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল।

আনিসুলের মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আনিসুলকে কারা মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট থেকে ভাগিয়ে নিয়েছেন, তাঁদের নাম পাওয়া গেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকায় সরকার অনুমোদিত ১৫টি বেসরকারি মানসিক হাসপাতালের ১৪টিই গড়ে উঠেছে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চারদিক ঘিরে অর্থাৎ মোহাম্মদপুরের হুমায়ুন রোড, বাবর রোড, শ্যামলী, আদাবর, মণিপুরিপাড়া, ফার্মগেট ও গ্রিন রোড এলাকায়। বাকি একটি বারিধারায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here