ব্যাংকিং খাতে পরিচালন মুনাফায় ভালো করলেও, নিট মুনাফা বাড়বেতো

ডেক্স রিপোর্ট: ব্যাংকিং খাতে বছরজুড়েই ছিল আমানতের সংকট নানা টানাপোড়েন। তবুও বছর শেষে ভালো পরিচালন মুনাফা পেয়েছে দেশের বেশির ভাগ ব্যাংক। যদিও উচ্চ ঋণ খেলাপিতে  খেয়ে ফেলবে ব্যাংকের পরিচালন মুনাফার বৃহৎ অংশ।

পরিচালন মুনাফা বাড়লেও নিট মুনাফা কমার চিত্র দেখা গেছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩০টি ব্যাংকের ক্ষেত্রে। চলতি বছরের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে ১৮টি ব্যাংকের নিট মুনাফাই গত বছরের একই সময়ের চেয়ে কমেছে। তালিকাভুক্ত ১১টি ব্যাংকের বাড়লেও সার্বিক নিট মুনাফা প্রবৃদ্ধিতে তা প্রভাব ফেলতে পারেনি। ২০১৭ সালের প্রথম তিন প্রান্তিকে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর সার্বিক নিট মুনাফা ৪ হাজার ৭২১ কোটি টাকা হলেও চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে ৪ হাজার ২৭৮ কোটি টাকায় নেমে আসে। সেপ্টেম্বরের মতোই বছর শেষের চিত্রও একই হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্বাভাবিক সময়ে প্রতি বছরের ৩০ ডিসেম্বর বার্ষিক হিসাবায়ন চূড়ান্ত করে ব্যাংক। এ বছর ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত হওয়ায় ব্যাংকগুলোর বার্ষিক হিসাব চূড়ান্তের সময় তিনদিন এগিয়ে আনে বাংলাদেশ ব্যাংক। যদিও নির্ধারিত দিনে দেশের বেশির ভাগ ব্যাংকই বার্ষিক হিসাবায়ন চূড়ান্ত করতে পারেনি।

দেশের সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীরা বলছেন, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহটি ব্যাংকারদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চলতি ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে ব্যাংকের কর্মদিবস পাওয়া গেছে মাত্র দুদিন। পরিচালন মুনাফার অংক পেতে আরো একদিন অপেক্ষা করতে হবে।

আয় থেকে ব্যয় বাদ দিয়ে যে মুনাফা থাকে, সেটিই ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা। পরিচালন মুনাফা থেকে খেলাপি ঋণ ও অন্যান্য সম্পদের বিপরীতে প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) এবং সরকারকে কর প্রদান করতে হয়। প্রভিশন ও কর-পরবর্তী মুনাফাই একটি ব্যাংকের প্রকৃত বা নিট মুনাফা।

জানাগেছে, চলতি বছরে দেশের বেশির ভাগ বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা বেড়েছে। প্রথমবারের মতো ১ হাজার কোটি টাকার বেশি পরিচালন মুনাফা পেয়েছে সাউথইস্ট ব্যাংক। ২০১৭ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৯০৬ কোটি টাকা।

প্রথমবারের মতো হাজার কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা অর্জন প্রসঙ্গে সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. কামাল হোসেন বলেন, হাজার কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা অর্জনের মাইলফলক স্পর্শ করার একটি দৃঢ় সংকল্প ছিল। এটি কাজ দিয়েছে। পরিচালন মুনাফায় ভালো প্রবৃদ্ধি এসেছে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকেরও। ব্যাংকটি প্রায় ৪৭৫ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা পেয়েছে। ২০১৭ সালে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা ছিল ৩৫৮ কোটি টাকা।

ফারমার্স ব্যাংক ছাড়া ভালো পরিচালন মুনাফা পেয়েছে নতুন প্রজন্মের ব্যাংকগুলোও। ২০১৭ সালে ১৪৬ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা পাওয়া মধুমতি ব্যাংক চলতি বছর ২০০ কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে।

২০১৭ সালের তুলনায় চলতি বছর পরিস্থিতি আরো বেশি খারাপ হয়েছে বেসিক ব্যাংকের। লুটপাটের শিকার ব্যাংকটি চলতি বছর বড় অংকের পরিচালন লোকসান গুনেছে। তবে খেলাপি ঋণ থেকে আদায় বাড়ায় ভালো করেছে হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে বিপর্যস্ত সোনালী ব্যাংক। ২০১৮ সালে ব্যাংকটি প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে। ২০১৭ সালে সোনালী ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা ছিল ১ হাজার ২০৬ কোটি টাকা।

বছরব্যাপী আমানত নিয়ে অস্থিরতাও ব্যাংকটির জন্য আশীর্বাদ ছিল। অলস পড়ে থাকা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার আমানত উচ্চসুদে কলমানি এবং বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ধার দিয়ে ভালো মুনাফা করেছে সোনালী ব্যাংক।

প্রায় সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা পেয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক। রূপালী ব্যাংকের এমডি মো. আতাউর রহমান প্রধান বলেন, ২০১৭ সাল শেষে রূপালী ব্যাংকের লোকসানি শাখা ছিল ৩৩টি। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা লোকসানি শাখা আটটিতে নামিয়ে আনতে পেরেছি। তবে প্রত্যাশা অনুযায়ী ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে টাকা আদায় সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল) পরিচালন মুনাফা পেয়েছে ১১৬ কোটি টাকা। তবে এননটেক্স ও ক্রিসেন্ট কেলেঙ্কারিতে বিপর্যস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক পরিচালন মুনাফায় হোঁচট খেয়েছে। চলতি বছরব্যাপী আলোচিত ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের এননটেক্স ও ক্রিসেন্ট গ্রুপের প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা। এর প্রভাবও পড়েছে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণে। সেপ্টেম্বর শেষে দেশের সবচেয়ে বেশি অংকের ঋণখেলাপি ব্যাংকের শীর্ষে উঠে গেছে জনতা ব্যাংকের নাম। ব্যাংকটির ১৪ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকার ঋণই এখন খেলাপি। সেপ্টেম্বর শেষে জনতা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা। ফলে জনতা ব্যাংকের পরিচালন মুনাফায়ও টান পড়েছে।

এ প্রসঙ্গে জনতা ব্যাংকের এমডি মো. আব্দুছ ছালাম আজাদ বলেন, আমানতের সুদহার নিয়ে টানাহেঁচড়ার কারণে আমাদের প্রায় ২০০ কোটি টাকা লোকসান দিতে হয়েছে। মূলধন ঘাটতি থেকে বের হয়ে আসতে বন্ড ছাড়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে।

বেসরকারি খাতের বেশির ভাগ ব্যাংকেরই পরিচালন মুনাফায় প্রবৃদ্ধির তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ব্যাংকগুলোর হিসাবায়ন চূড়ান্ত না হওয়ায় এখনই তথ্য জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন শীর্ষ নির্বাহীরা। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভালো পরিচালন মুনাফা পেয়েছে ইসলামী ব্যাংক, পূবালী, ডাচ্-বাংলা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, ব্যাংক এশিয়া, যমুনা, ন্যাশনাল, ইউসিবি, প্রাইম, ব্র্যাক, প্রিমিয়ার, ইস্টার্ন ও মার্কেন্টাইল ব্যাংক।

পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল হালিম চৌধুরী বলেন, বছরব্যাপী ব্যাংকিং খাত নিয়ে নেতিবাচক প্রচার ছিল। তার পরও পূবালী ব্যাংক প্রত্যাশার চেয়ে বেশি পরিচালন মুনাফা পেয়েছে। আমরা সবসময় ধীরলয়ে পথ চলায় বিশ্বাসী। এটিই চলতি বছর সবচেয়ে বেশি কাজ দিয়েছে।

পরিচালন মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হলেও খেলাপি ঋণের লাগামহীন গতি পুরো অর্জনকে ম্লান করে দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সূত্র বলছে, ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। কিন্তু চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। মাত্র নয় মাসের ব্যবধানে ব্যাংকিং খাতে ২৫ হাজার ৬৭ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ বেড়েছে।

বছরের শেষ তিন মাসে আরো বড় অংকের ঋণ খেলাপির খাতায় যুক্ত হয়েছে। তবে বছর শেষে খেলাপি ঋণ কম দেখাতে গত এক মাসে বিপুল অংকের ঋণ পুনঃতফসিল করেছে ব্যাংকগুলো। নামমাত্র ডাউনপেমেন্ট নিয়েও অনেক খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকও সীমাহীন উদারনীতি গ্রহণ করেছে। বিপুল অংকের এ খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গিয়েই পরিচালন মুনাফা হারাবে ব্যাংকগুলো। বণিক বার্তা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here