ব্যাংকিং খাতসহ পুঁজিবাজারের উন্নয়নে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ

মোহাম্মদ তারেকুজ্জামান : দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারে অধিকাংশ সাধারণ বিনিয়োগাকারী বিনিয়োগে আগ্রহী না হওয়ায় সব থেকে বেশি খারাপ প্রভাব পড়েছে ব্যাংকিং খাতে। যে কারণে এই খাতের ফান্ডামেন্টাল কোম্পানিগুলোর শেয়ার দর আশানূরুপ বৃদ্ধি পায়নি এতাদিনেও। ফেসভ্যালুর আশেপাশেই অবস্থান করছে কোম্পানিগুলোর শেয়ার দর। যা কখনই কাম্য নয়। এই খাতের শেয়ার দর কম হওয়ার পিছনে আরও কিছু কারণ রয়েছে। যেমন গ্যাম্লাররা অন্যান্য সেক্টরের শেয়ার দর গ্যাম্লিং করে সহজেই উঠাতে এবং নামাতে পারে। কিন্তু ব্যাংকিং সেক্টরে সে সুযোগ নেই। কারণ প্রত্যেকটি ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রুলস অ্যান্ড রেগুলেশন্স অনুযায়ী চলে। এখানে গ্যাম্লাররা গ্যাম্লিং সহজেই করতে পারে না বলে মত দিয়েছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

পুঁজিবাজারে তালিকাভূক্ত ব্যাংকিং সেক্টরে মোট ৩২ টি কোম্পানি রয়েছে। কোম্পানিগুলো হলো-এবি ব্যাংক লিমিটেড, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, ব্যাংক এশিয়া লিমিটেড, ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেড, দি সিটি ব্যাংক লিমিটেড, ঢাকা ব্যাংক লিমিটেড, ডাচ বাংলা ব্যাংক লিমিটেড, ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড, এক্সিম ব্যাংক লিমিটেড, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক লিমিটেড, আইএফআইসি ব্যাংক লিমিটেড, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, যমুনা ব্যাংক লিমিটেড, মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেড, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড, ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড, ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক লিমিটেড, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড, ওয়ান ব্যাংক লিমিটেড, প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেড, পুবালী ব্যাংক লিমিটেড, রুপালি ব্যাংক লিমিটেড, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক লিমিটেড, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, সাউথইস্ট ব্যাংক লিমিটেড, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক লিমিটেড, ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড, উত্তরা ব্যাংক লিমিটেড।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সভাপতি মো. ছায়েদুর রহমান স্টক টাইমসকে বলেন, দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ আশানূরুপ না থাকায় ব্যাংকিং সেক্টরের কোম্পানিগুলোর শেয়ার দর বৃদ্ধি পাচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করে ডিভিডেন্ডের আশায় বসে থাকতে চায় না সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। তারা ক্যাপিটাল গেইনে বেশি আগ্রহী। ডিভিডেন্ড গেইনে তেমন আগ্রহ দেখায় না। তাছাড়া দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আশানূরুপ ডিভিডেন্ড পায় না। আর আশানূরুপ ডিভিডেন্ড না পাওয়ার মূল কারণ হচ্ছে আমাদের দেশের টেক্স সিস্টেম। কোম্পানিগুলো প্রফিট হওয়ার পর সরকারকে সেই প্রফিটের ওপর টেক্স দেয়। এরপর কোম্পানিগুলো যখন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ডিভিডেন্ড ঘোষণা করে সেই ডিভিডেন্ডের ওপর আবার টেক্স দিতে হয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ডিভিডেন্ডের প্রতি খুব একটা আগ্রহ দেখায় না।

এছাড়াও তিনি আরও বলেন, অন্যান্য কোম্পানিগুলোর ন্যায় ব্যাংকিং সেক্টরের শেয়ার দর খুব বেশি উঠা-নামা করে না। সেকারণেই সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এই সেক্টরে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখায় না। তবে সরকার যদি টেক্স সিস্টেম পুঁজিবাজার বান্ধব করে সেক্ষেত্রে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। তখন সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং সেক্টরসহ পুঁজিবাজারের উন্নয়ন হবে। কারণ দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ না থাকলেও ব্যাংকিং খাতসহ পুঁজিবাজারের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

ইউনিয়ন ব্যাংকের কোম্পানি সচিব আলি হোসেন ভূঁইয়া স্টক টাইমসকে বলেন, অন্যান্য সেক্টরের তুলনায় ব্যাংকিং সেক্টরের কোম্পানিগুলো ভালো মানের। ফান্ডামেন্টাল কোম্পানি। অথচ এই সেক্টরের প্রতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ খুব বেশি দেখা যায় না। এটা খুবই দুঃখজনক।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শেয়ারবাজারের এক বিনিয়োগকারী স্টক টাইমসকে বলেন, অন্যান্য অধিকাংশ কোম্পানি নিজেরাই গ্যাম্লার। তারা গ্যাম্লিংয়ের সাথে সরাসরি জরিত থাকে। তাই সেসব কোম্পানির শেয়ার দর উঠা-নামা বেশি করে। অপর দিকে ব্যাংকিং খাতে গ্যাম্লিংয়ের সুযোগ থাকে না। কারণ ব্যাংকগুলোকে সরাসরি নজরদারিতে রাখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা বাংলাদেশ ব্যাংক। তাই সাধারণ নিয়মে ব্যাংকের শেয়ার দর উঠে বা নামে। খুব বেশি শেয়ার দর উঠা-নামা করে না। আর অধিকাংশ বিনিয়োগকারী যেসব কোম্পানির শেয়ার দর বৃদ্ধি পায় প্রতিনিয়ত সেসব শেয়ারে বিনিয়োগ করতে বেশি আগ্রহী। কারণ তারা শর্ট টার্মে বিনিয়োগ করে ক্যাপিটাল গেইনে বেশি আগ্রহী থাকে। লং টার্মে বা দীর্ঘ মেয়াদে তারা বিনিয়োগ করে ডিভিডেন্ড গেইনে আগ্রহী নয়।

উল্লেখ্য পুঁজিবাজারের তালিকাভূক্ত ব্যাংকিং সেক্টরের কোম্পানিগুলোর মধ্যে আজ সোমবার, ০৩ জানুয়ারি উত্তরা ব্যাংকের ক্লোজিং প্রাইজ ছিলো ২৫ দশমিক ৬০ টাকা, কোম্পানিটি ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ সমাপ্ত বছরে ২৫ শতাংশ ডিভিডেন্ড দিয়েছে। এরমধ্যে সাড়ে ১২ শতাংশ ক্যাশ এবং সাড়ে ১২ শতাংশ স্টক।

এছাড়াও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, সাউথ ইস্ট ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং সাউথ ব্যাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক লিমিটেডের যথাক্রমে এদিন ক্লোজিং প্রাইজ ছিলো ১৬ দশমিক ৫০ টাকা, ১০ দশমিক ৩০ টাকা, ১৫ দশমিক ৭০ টাকা, ১৪ দশমিক ৯০ টাকা এবং ১৫ দশমিক ৯০ টাকা; এছাড়াও কোম্পানিগুলো যথাক্রমে ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ সমাপ্ত বছরে ডিভিডেন্ড দিয়েছে ১০ শতাংশ, ৫ শতাংশ, ১০ শতাংশ, ১০ শতাংশ এবং ৮ শতাংশ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here