বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ব্যবসা বাড়ার সম্ভবনা

স্টাফ রিপোর্টার: বৈদেশিক বাণিজ্যের ৪০ শতাংশ পণ্য পরিবহনের সুযোগ ছিল বাংলাদেশী পতাকাবাহী সমুদ্রগামী জাহাজের। এ হিস্যা বাড়িয়ে ৫০ শতাংশে উন্নীত করতে  “বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ (সুরক্ষা) আইন ২০১৯” আইনের খসড়া গতকাল মন্ত্রিসভা নীতিগত অনুমোদিত হয়েছে। এ বিষয় সচিবালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম।

বাংলাদেশে নিবন্ধিত জাহাজগুলোকে বাংলাদেশী পতাকাবাহী জাহাজ বলা হয়। সমুদ্রগামী জাহাজ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ওশান গোয়িং শিপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশী পতাকাবাহী সমুদ্রগামী জাহাজের সংখ্যা ছিল ৬৩। এর মধ্যে বেসরকারি জাহাজ ছিল ৫২ ও সরকারি ১১টি।  ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনকারী বাংলাদেশী পতাকাবাহী জাহাজ কমে দাঁড়ায় ৩৮টিতে। তবে গত বছর চীন থেকে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) সমুদ্রগামী দুটি জাহাজ কিনে দেশে এনেছে। দেশে আসার অপেক্ষায় আছে আরো চারটি।

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের পাশাপাশি সমুদ্রগামী পণ্য পরিবহনের ব্যবসা আছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এইচআর শিপিং, আকিজ, আবুল খায়ের, এমজেএল বাংলাদেশ, কবির স্টিল, ক্রাউন ও সিটি গ্রুপসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এ-সংক্রান্ত বর্তমান অধ্যাদেশে বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজের মাধ্যমে ৪০ শতাংশ পণ্য পরিবহনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নতুন আইনে এটা বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। আইনের বিধান লঙ্ঘন করে কোনো পণ্য পরিবহন করা হলে ৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। বর্তমান অধ্যাদেশে জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণ করা ছিল না। যদি শিপিং করপোরেশন পর্যাপ্ত জাহাজের ব্যবস্থা করতে না পারে, তাহলে অন্য জাহাজ দিয়ে পণ্য আনার সুযোগ রয়েছে।

বাণিজ্যের ৫০ শতাংশ পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, অবশ্যই প্রথমে পতাকাবাহী জাহাজ ব্যবহার করতে হবে। এরপর যদি প্রয়োজন হয়, তবে অন্য প্রতিষ্ঠানের জাহাজ ব্যবহার করা যেতে পারে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানির ওপর ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা প্রত্যাহারের পর নতুন জাহাজ আমদানি করেননি স্থানীয়রা। পাশাপাশি করপোরেট করসহ অন্যান্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অন্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে না ওঠায় পুরনো জাহাজ প্রতিস্থাপন করেননি তারা। ফলে কমে গেছে বাংলাদেশী পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা; সেই সঙ্গে ফ্রেইট চার্জ বাবদ আয়ও।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে আন্তর্জাতিক মানের জাহাজ (ওশান গোয়িং কার্গো) কমে যাওয়ায় তা ১ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। রফতানি পণ্যের অর্ধেকের বেশি একসময় স্থানীয় জাহাজগুলো পরিবহন করলেও কমেছে তাও। মূলত বৈশ্বিক বাণিজ্যে মন্দা, জাহাজ আমদানিতে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (মূসক), ৫ শতাংশ এটিভি ও ৩৫ শতাংশ হারে করপোরেট করের কারণে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন দেশীয় উদ্যোক্তারা।

১৯৯৪ সালের ৯ জুন এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তিন হাজার টনের বেশি (ডেডওয়েট টনেজ বা ডিডব্লিউটি) ধারণক্ষমতার জাহাজ আমদানিতে ভ্যাট অব্যাহতি দেয় এনবিআর। ২০১২ সাল পর্যন্ত তা কার্যকর ছিল। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা বন্ধ করে দেয়ার পর জাহাজ আমদানি বা উৎপাদন পর্যায়ে ব্যবসায়ীদের ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর যুক্ত হয়। ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা সম্প্রসারণ বা নতুন করে কেউ আর এ ব্যবসায় নামেনি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আমদানি-রফতানির বিপরীতে ফ্রেইট চার্জ বাবদ দেশের ব্যবসায়ীরা ব্যয় করেছেন ৭৭০ কোটি ডলার বা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে মাত্র সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা ধরতে পেরেছে বাংলাদেশী পতাকাবাহী জাহাজগুলো। বাকি ৫৫ হাজার কোটি টাকা বা ৮৫ শতাংশই নিয়ে গেছে বিদেশী পতাকাবাহী জাহাজগুলো।

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে ২০১২ সাল থেকে সমুদ্রগামী পতাকাবাহী জাহাজের আমদানি ও নিবন্ধন নেননি স্থানীয় উদ্যোক্তারা। তবে ২০১৮ সালে বাংলাদেশী পতাকাবাহী সমুদ্রগামী জাহাজ আমদানিতে ভ্যাট ও কর ছাড় দিয়ে প্রণোদনা দেয়ায় গতি পায় এ ব্যবসায়। এক বছরের মধ্যে ওমেরা, ক্রাউন সিমেন্ট, আকিজ গ্রুপসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এনবিআরের শর্তসাপেক্ষে জাহাজ আমদানি করেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here