বাংলাদেশের হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি ঘুরে দাঁড়িয়েছে

দীর্ঘদিন পর হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানিতে সুবাতাস ফিরলেও তাতে খুব একটা তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে রাজি নন রপ্তানিকারকেরা। তাঁদের দাবি, করোনাভাইরাস পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোতে চিংড়ির চাহিদা বেড়েছে। আবার প্রতিযোগী দেশগুলো উচ্চফলনশীল জাতের ভেনামি চিংড়ির দিকে ঝুঁকেছে। সে জন্য বাগদা চিংড়ির দাম আগের তুলনায় কিছুটা বেশি মিলছে। অন্যদিকে গন্তব্যভেদে পণ্যবাহী কনটেইনার ভাড়া চার-পাঁচ গুণ বেড়ে যাওয়ায় হিমায়িত চিংড়ির রপ্তানি আয় বেড়েছে। প্রকৃতপক্ষে রপ্তানির পরিমাণ বাড়েনি।

এই শতাব্দীতে দেশ থেকে সর্বোচ্চ ৫৫ কোটি ডলারের চিংড়ি রপ্তানি হয়েছিল ২০১৩-১৪ অর্থবছরে। তারপর টানা সাত বছর পণ্যটির রপ্তানি কমেছে। সর্বশেষ গত ২০২০–২১ অর্থবছরে ৩৩ কোটি ডলারের চিংড়ি রপ্তানি হয়েছে, যা দেশি মুদ্রায় ২ হাজার ৮৩৮ কোটি টাকা। এই আয় তার আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ১৫ শতাংশ কম।

অবশ্য চিংড়ির বৈশ্বিক বাজারের তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ খুবই নগণ্য। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী চিংড়ির বাজার ছিল ৩ হাজার ১৬০ কোটি ডলারের, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা। ২০২৭ সালে এই বাজার বেড়ে ৫ হাজার ৪৬০ কোটি ডলারে দাঁড়াবে। বাজারটি কত বড় হবে তা বোঝার জন্য একটি পরিসংখ্যান দেওয়া যেতে পারে। সেটি হচ্ছে, গত ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৮৭৫ কোটি ডলার।

জানতে চাইলে হিমায়িত খাদ্য রপ্তানিকারক সমিতির সাবেক সভাপতি কাজী বেলায়েত হোসেন  বলেন, ‘দুই দশক আগে থেকে দামে সস্তা হওয়ায় দুনিয়াজুড়ে ভেনামি চিংড়ির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। বর্তমানে সারা বিশ্বে যে চিংড়ি রপ্তানি হয় তার ৭৭ শতাংশই ভেনামি জাতের। অথচ আমাদের রপ্তানিতে এটি নেই। সে জন্য সম্ভাবনা থাকার পরও চিংড়ি রপ্তানির বাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশ।’ তিনি বলেন, বাণিজ্যিকভাবে ভেনামি চিংড়ি চাষ শুরু হলে দেশের মানুষ ২০০-৩০০ টাকা কেজি দরে তা কিনে খেতে পারবেন।

দেশে বর্তমানে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী, বরগুনা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী ও ময়মনসিংহে চিংড়ি চাষ হয়। রপ্তানির জন্য ১০৫টি চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ৭৬টি ইইউর অনুমোদন পাওয়া। ১০৫টি কারখানার বছরে ৪ লাখ মেট্রিক টন চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা রয়েছে। এর বিপরীতে চিংড়ি উৎপাদন পৌনে তিন লাখ টনের কম। চাহিদা অনুযায়ী কাঁচামাল না পাওয়ায় বর্তমানে ৪০টি কারখানা চালু আছে। তার মধ্যে নিয়মিত উৎপাদন করে ২৫-৩০টি কারখানা। সেগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, দেশে গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২ লাখ ৭০ হাজার ১৪ মেট্রিক টন চিংড়ি উৎপাদন হয়। তার আগের বছর উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ৫৮ হাজার ৩৯ মেট্রিক টন। ওই দুই বছর হেক্টরপ্রতি চিংড়ি উৎপাদন হয় যথাক্রমে ৯৯৮ কেজি ও ১ হাজার ৪৭ কেজি।

চিংড়ি রপ্তানিকারকেরা বলছেন, সনাতন পদ্ধতিতে প্রতি হেক্টরে গড়ে ২৫০-৩০০ কেজি গলদা ও বাগদা চিংড়ির উৎপাদন হয়। সেমি ইনসেনটিভ বা আধা নিবিড় পদ্ধতিতে চাষ করলে সেটি ৩-৪ হাজার কেজি পর্যন্ত হয়। আর উচ্চফলনশীল জাতের ভেনামি করলে উৎপাদন হয় গড়ে ৯-১০ হাজার কেজি।

বিশ্ব খাদ্য সংস্থা ও গ্লোবাল অ্যাকুয়াকালচার অ্যালায়েন্সের তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সালে বিশ্বে ৪৬ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন চিংড়ি উৎপাদন হয়। তার মধ্যে ভেনামি চিংড়ি ছিল ৭৬ দশমিক ৫১ শতাংশ বা সাড়ে ৩৫ লাখ মেট্রিক টন। বাগদা ও গলদা চিংড়ির উৎপাদন ছিল যথাক্রমে সাড়ে ৫ লাখ ও ২ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন।

এশিয়া অঞ্চলে ভেনামি চিংড়ি চাষে চীন, ভারত ও ভিয়েতনাম রাজত্ব করছে। ২০১৯ সালে চীনে ১১ লাখ ৪৪ হাজার, ভারতে ৭ লাখ ২৪ হাজার, ভিয়েতনামে ৫ লাখ ৬৮ হাজার ও থাইল্যান্ডে ২ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ভেনামি চিংড়ি উৎপাদন হয়। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়ায় ২ লাখ ২০ হাজার এবং মালয়েশিয়ায় ১ লাখ ৭৫ হাজার মেট্রিক টন চিংড়ি উৎপাদন হয়।

বাংলাদেশে ভেনামি চিংড়ি চাষের অনুমতি চেয়ে সরকারের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে দেনদরবার করে আসছেন রপ্তানিকারকেরা। তবে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে—এমন যুক্তিতে ভেনামি চাষে উৎসাহ বা অনুমতি কোনোটাই দেয়নি মৎস্য অধিদপ্তর। অবশেষে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সরকার পরীক্ষামূলকভাবে এই চিংড়ি চাষের অনুমতি দেয়। দুটি প্রতিষ্ঠান অনুমোদন পেলেও চাষ করে শুধু যশোরের এমইউ সি ফুডস। করোনার কারণে বিদেশ থেকে পোনা আনতে না পারায় সেই চাষও সময়মতো শুরু করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। গত বছর থাইল্যান্ড থেকে পোনা আনার পর চাষ শুরু হয়। সেই চাষ শেষপর্যন্ত সফল হয়।

চলতি বছর এমইউ সি ফুডসের পাশাপাশি খুলনার গ্রোটেক অ্যাকোয়াকালচার এবং ফাহিম সি ফুডসকে পরীক্ষামূলকভাবে ভেনামি চিংড়ি চাষের অনুমোদন দিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর। এর বাইরে কক্সবাজার, খুলনা ও সাতক্ষীরার ১৬টি প্রতিষ্ঠানকে পরীক্ষামূলক চাষের অনুমোদন দেওয়ার বিষয়টি এখন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

রপ্তানিকারকেরা বলছেন, সেমি-ইনটেনসিভ পদ্ধতিতে ভেনামি চিংড়ি চাষ খুবই ব্যয়বহুল। পরীক্ষামূলক চাষের পরিবর্তে বাণিজ্যিকভাবে অনুমোদন দিলে ব্যবসায়ীরা আগ্রহী হবেন। অন্যথায় পুরো বিষয়টি ঝুলে যেতে পারে। তা ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে ভেনামির পোনা উৎপাদনেরও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

পরীক্ষামূলকভাবে ভেনামি চিংড়ি চাষে সফল হয়েছে যশোরের এমইউ সি ফুডস, যারা সাড়ে তিন দশক ধরে এই ব্যবসা করছে। প্রতিষ্ঠানটি সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরে ৮৭ কোটি টাকার হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি করেছে। তার আগের বছরে তাদের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৭৯ কোটি টাকা। তাদের কারখানায় প্রতিদিন ১২ টন চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা রয়েছে। এ জন্য বছরে ৩০-৪০ লাখ কেজি চিংড়ির প্রয়োজন। কিন্তু কাঁচামাল সংকটের কারণে মাত্র ১০ লাখ কেজি চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত করতে পারছে তারা।

বিষয়টি নিশ্চিত করে এমইউ সি ফুডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শ্যামল দাস বলেন, করোনাকালে বিশ্বব্যাপী সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দামই বাড়তি। এ কারণে বাগদা চিংড়ির দাম ২৫-৩০ শতাংশ বেড়েছে। তা ছাড়া ইউরোপ ও আমেরিকামুখী রপ্তানি পণ্যের জাহাজ ভাড়া বেড়েছে ৪-৫ গুণ। ফলে চলতি অর্থবছর রপ্তানি আয় কিছুটা বেড়েছে। তবে গত কয়েক বছর রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে কমেছে।

শ্যামল দাস আরও বলেন, ভারত বর্তমানে যে পরিমাণ চিংড়ি রপ্তানি করে, তার ৯০ শতাংশই ভেনামি। এখন তারা রপ্তানি বাড়াতে বাগদার চাষ বাড়াতে চায়। কারণ, আমদানিকারকেরা ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে ভেনামির সঙ্গে অল্প কিছু বাগদা ও গলদা কেনে। আমরা যদি বাগদার সঙ্গে ভেনামিতে যেতে পারি, তাহলে পাঁচ বছরের মধ্যে এই খাতে রপ্তানি আয় ২০০ কোটি মার্কিন ডলারে উন্নীত করা যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here