প্রবৃদ্ধি বেশ, কিন্তু আমার চাকরি কই?

‘উৎপাদনশীলতা বাড়লে শ্রমিকের সংখ্যা কমবে। ফলে প্রবৃদ্ধি হয়তো হবে, কিন্তু কর্মসংস্থান সেভাবে হবে না। এটাকে সামাল দেওয়ার জন্য বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রয়োজন।’

পাঁচ বছরে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির গড় হার ৭ শতাংশেরও বেশি। বিশ্ব অর্থনীতিতে এ এক ঈর্ষণীয় প্রবৃদ্ধি।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় গড় এই প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে সামান্য কম। পরিকল্পনার শেষ বছরটিতে (২০১৯-২০২০) কোভিড হানা না দিলে প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে যেত। পরিকল্পনার পাঁচ বছরে ৭.৪ শতাংশের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য থাকলেও অর্জিত হয়েছে ৭.১৩ শতাংশ।

কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দিয়ে ২০১৫ সালের জুলাই মাসে যাত্রা শুরু সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১৬-২০২০) পুরো সময় জুড়ে জিডিপির এই উচ্চ প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া কর্মসংস্থানে লক্ষ্য করা যায়নি। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এ সময়ে কর্মসংস্থান কম হয়েছে ৩৪ লাখ।

বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, প্রবৃদ্ধির সঙ্গে শুধু কর্মসংস্থানই নয়, উৎপাদনের অন্যান্য তথ্য-উপাত্তেরও সামঞ্জস্য নেই। প্রবৃদ্ধির হারের যে হিসাব দেওয়া হচ্ছে, তার যথার্থতা নিয়ে তাই প্রশ্ন তাদের। তবে এটা সবাই মানেন, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না হওয়ার বড় কারণ বেসরকারি বিনিয়োগে বছরের পর বছর ধরে চলা বন্ধাত্ব। এটা ২২-২৩ শতাংশে আটকে রয়েছে।

তারা মনে করেন, বেসরকারি বিনিয়োগ না বাড়ানো গেলে কর্মসংস্থানের কোনো লক্ষ্যমাত্রাই অর্জন হবে না।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় শুধু নতুন কর্মসংস্থানই কম হয়নি, চাকরি হারানোর ঘটনাও বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা এবং অর্থনীতিবিদরা একমত, শিল্পে, বিশেষভাবে ম্যানুফ্যাকচারিংখাতে অটোমেশন এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। তাতে উৎপাদনশীলতা বাড়ছে বটে, কিন্তু মানুষ চাকরি হারাচ্ছে।

গত জুনে সমাপ্ত সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মূল্যায়ন প্রতিবেদনে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ  (জিইডি) বলেছে, আলোচ্য সময়ে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ২৯ লাখ। কিন্তু অর্জন হয়েছে ৯৫ লাখ।

এ সময়ে অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানের অর্জন লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক পিছিয়ে থাকলেও বেড়েছে বৈদেশিক কর্মসংস্থান। দেশের ভেতরে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৫৫ ভাগ অর্জন করা গেছে। কিন্তু বৈদেশিক কর্মসংস্থানে অর্জন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৭৫ ভাগ বেশি।

অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানে বিপুল এই ঘাটতি সম্পর্কে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য ড. শামসুল আলম বলেন, পরিকল্পনার প্রথম তিন অর্থবছরে কর্মসংস্থানে গতি ছিল। শেষের দুই বছর কর্মসংস্থান কিছুটা কমেছে। তিনি বলেন, রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পসহ ম্যানুফেকচারিংখাতে আটোমেশনের কারণে কর্মসংস্থান লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) ডিস্টিঙ্গুইসড ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ার একটি ব্যাখ্যা হতে পারে, তথ্য উপাত্ত ঠিক নেই। প্রবৃদ্ধির হিসাব নিয়ে সংশয় আছে। আর প্রবৃদ্ধির তথ্য যদি সঠিক থাকে, তাহলে বলতে হবে, যে ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তা কর্মসংস্থানমুখী নয়।’

তিনি বলেন, উচ্চ প্রবৃদ্ধি হলেও বেসরকারি বিনিয়োগ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হয়েছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ আরও কম হয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে না।

বিভিন্ন শিল্পে শ্রমের পরিবর্তে পুঁজির প্রতিস্থাপনকেও কর্মসংস্থান কমার একটি কারণ বলে মনে করেন তিনি।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুরও প্রবৃদ্ধির উচ্চ হারের বিষয়টি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।

তিনি বলেন, কর্মসংস্থানের বড় জায়গা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। কিন্তু এখানে নতুন উদ্যোক্তা সেভাবে তৈরি হচ্ছে না। দক্ষতার অভাবকে কর্মসংস্থান না হওয়ার একটা কারণ হিসেবে মনে করেন তিনি। আহসান এইচ মনসুর বলেন, দক্ষতার ঘাটতি থাকায় দেশের শ্রমবাজার থেকে কর্মী না নিয়ে বিদেশ থেকে বেসরকারি খাত অনেক কর্মী আমদানি করেছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) ডিস্টিঙ্গুইসড ফেলো ড. মোস্তফিজুর রহমান মনে করেন, উৎপাদনশীলতা বাড়লে শ্রমিকের সংখ্যা কমবে। ফলে প্রবৃদ্ধি হয়তো হবে, কিন্তু কর্মসংস্থান সেভাবে হবে না। এটাকে সামাল দেওয়ার জন্য বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘কর্মসংস্থানের লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ার মূল কারণ, আমরা ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগে চাঞ্চল্য আনতে পারিনি। ৫ বছরে ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ জিডিপি অনুপাতে  থেকে ২৬ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বেড়েছে মাত্র ১ শতাংশ। পরিকল্পনায় সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) লক্ষ্য ছিল ৩০ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু নীট এসেছে ১০ বিলিয়ন ডলারের মতো।

অষ্টম পরিকল্পনায় শিল্পে কর্মসংস্থান আরও কমবে

অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার (২০২১-২০২৫) খসড়ায় অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা সপ্তম পরিকল্পনার চেয়ে কমিয়ে ধরা হয়েছে। নতুন পরিকল্পনায় অভ্যন্তরীণ লক্ষ্যমাত্রা ৮৪ লাখ, যা গত পরিকল্পনার চেয়ে ২৫ লাখ কম। তবে অষ্টম পরিকল্পনায় বৈদিশিক কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা আগের চেয়ে ১৫ লাখ বাড়িয়ে ৩৫ লাখ প্রাক্কলন করা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য সামসুল আলমও মনে করেন, অষ্টম পরিকল্পনার ৫ বছরে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে কর্মসংস্থান কমে যাবে। আটোশনের কারণেই এমনটা ঘটবে বলে তিনি মনে করেন।

অষ্টম পরিকল্পনার খসড়াতে বলা হয়েছে, পোশাক কারখানায় লেবার-সেভিং প্রযুক্তি ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে আনুমানিক ১০ লাখ লোক চাকরি হারাবে।

খসড়ায় বলা হয়, অটোমেশনের কারণে পুরষের চেয়ে বেশি চাকরি হারাবেন নারীরা।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই)  নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘অটোমেশনের কারণে কর্মসংস্থান কমবে। এটা শুধু আমাদের দেশেই ঘটছে না। সারা বিশ্বের চিত্র একই।’

বেসরকারি খাত বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাশরুর রিয়াজ বলেন, বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাড়া অবশ্যই বড় একটা সুবিধা। কিন্তু শ্রমবাজারে যারা আসছে তাদের বড় অংশের কর্মসংস্থান কখনোই বিদেশে হবে না। তিনি বলেন, রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের মতো শ্রমঘন শিল্পে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে আছে। অটোমেশনের কারণে পোশাক খাত মানুষের বদলে মেশিনের দিকে ঝুঁকছে।

মাশরুর রিয়াজ বলেন, ‘আমরা রপ্তানী পণ্যের বহুমুখীকরণ নিয়ে অনেক কথা বলি। কর্মসংস্থানের জন্য পাশাপাশি দরকার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিরও বৈচিত্র্যকরণ। নতুন খাতের বিকাশ এবং তাতে বিনিয়োগ না বাড়লে অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানের সুযোগও সেভাবে সৃষ্টি হবে না।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here