পুঁজিবাজারবহির্ভূত উৎপাদনশীল খাতে করছাড়

করপোরেট করের উচ্চ হারের কারণে দেশে বিনিয়োগ ব্যয় বেড়েছে। কভিডের কারণে সংকটে থাকা ব্যবসায়ীরা সব খাতে এই করহার কমানোর দাবি জানালেও আগামী অর্থবছরের বাজেটে শুধু উৎপাদনশীল খাতের সঙ্গে জড়িত পুঁজিবাজারে তালিকাবহির্ভূত শিল্পের করপোরেট করহার কমানো হচ্ছে।

অন্যদিকে আগামী অর্থবছরেও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকছে। তবে চলতি বাজেটে এ ক্ষেত্রে দেওয়া বিশেষ সুযোগ সীমিত করা হতে পারে। অর্থপাচার বন্ধে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। দুই লাখ টাকার বেশি আমদানি-রপ্তানি করলেই ই-পেমেন্টে শুল্ক কর পরিশোধ বাধ্যতামূলক থাকছে। বিড়ি-সিগারেট-জর্দার রাজস্ব হার বাড়ানো হবে। এ ছাড়া অর্থপাচার চিহ্নিত হলে পাচারকৃত অর্থের ওপর নিয়মিত করের বাইরে আরো ৫০ শতাংশ কর পরিশোধ করতে হবে।

করপোরেট করহার
অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় বাংলাদেশে করপোরেট করহার বেশি। বাংলাদেশে করপোরেট করহার ভিয়েতনামের তুলনায় ১৫ শতাংশ, মালয়েশিয়ার তুলনায় ১১ শতাংশ, চীন, ইন্দোনেশিয়া ও মিয়ানমারের তুলনায় ১০ শতাংশ, পাকিস্তানের তুলনায় ৬ শতাংশ এবং ভারত ও ফিলিপাইনের তুলনায় ৫ শতাংশ বেশি।

বিদ্যমান কর কাঠামো অনুযায়ী, করপোরেট করের আটটি স্তর আছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কম্পানিকে ২৫ শতাংশ, তালিকাবহির্ভূত কম্পানিকে ৩২.৫ শতাংশ, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ও ২০১৩ সালে অনুমোদন পাওয়া নতুন ব্যাংককে ৩৭.৫ শতাংশ, তালিকাবহির্ভূত ব্যাংককে ৪০ শতাংশ, মার্চেন্ট ব্যাংককে ৩৭.৫০ শতাংশ, সিগারেট, জর্দা ও গুলসহ তামাকজাত দ্রব্য প্রস্তুতকারী কম্পানিকে ৪৫ শতাংশ, তালিকাভুক্ত মোবাইল কম্পানিকে ৪০ শতাংশ ও তালিকাবহির্ভূত কম্পানিকে ৪৫ শতাংশ এবং লভ্যাংশ আয়ের ওপর ২০ শতাংশ করপোরেট কর দিতে হয়।

এর বাইরে তৈরি পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠানকে ১০ ও ১২ শতাংশ এবং সমবায় প্রতিষ্ঠানকে ১৫ শতাংশ হারে করপোরেট কর দিতে হয়। আগামী অর্থবছরের বাজেটে উৎপাদনশীল খাতের সঙ্গে জড়িত শুধু পুঁজিবাজারে তালিকাবহির্ভূত শিল্পের করপোরেট করহার ৩২.৫ থেকে কমিয়ে ৩০ শতাংশ ধার্য করা হচ্ছে। অর্থাৎ পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যেসব প্রতিষ্ঠান উৎপাদনশীল কাজে জড়িত সেসব প্রতিষ্ঠানের করপোরেট করহার ২.৫ শতাংশ কমানো হচ্ছে।

দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনা সংক্রমণের জন্য দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক ধারা ব্যাহত হয়েছে। অনেকে লোকসানে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সব খাতে করপোরেট করহার কমানো হলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। অনেকে বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। দু-একটি খাতে করপোরেট করহার কমানো হলে পুরো অর্থনীতিতে সুফল পাওয়া যাবে না।’

অর্থপাচারের শাস্তি
আমদানি-রপ্তানিতে যে পরিমাণ অর্থ আন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিং করে পাচার হয়েছে বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তদন্তে চিহ্নিত হবে এবং যে পরিমাণ প্রদর্শিত বিনিয়োগ ভুয়া হিসেবে প্রমাণিত হবে তার ওপর নিয়মিত করের বাইরে অতিরিক্ত আরো ৫০ শতাংশ হারে কর পরিশোধ করতে হবে।

ই-পেমেন্টে রাজস্ব পরিশোধ
দুই লাখ টাকার বেশি আমদানি-রপ্তানি করা হলে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারককে অবশ্যই ই-পেমেন্টে শুল্ক কর পরিশোধ করতে হবে। এতে কী পরিমাণ পণ্য কত দামে এনেছে এবং এতে কী পরিমাণ শুল্ক কর পরিশোধ করেছে তা অনলাইনে খতিয়ে দেখা সম্ভব হবে।

কালো টাকা সাদা
চলতি অর্থবছরে আবাসন খাতে ও পুঁজিবাজারে বিনা প্রশ্নে ১০ শতাংশ হারে কর দিয়ে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়। আসছে বাজেটে বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে তা সীমিত করা হবে বলে জানা গেছে।

গত অর্থবছরে বিভিন্ন খাতে নিয়মিত করের বাইরে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করা যেত। এতে কালো টাকা সাদা করতে অতিরিক্ত কর গুনতে হতো। এতে অনেকে উচ্চ হারে কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করতে আগ্রহী হতেন না। এ ক্ষেত্রে এনবিআর কোনো প্রশ্ন না তুললেও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) সরকারের অন্যান্য সংস্থা খতিয়ে দেখেছে কোথা থেকে অর্থ এসেছে। স্বাধীনতার পর প্রায় সব সরকারের আমলেই কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার নজরে পড়ার আশঙ্কায় টাকা সাদা হয়েছে সামান্যই। এ পর্যন্ত প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা সাদা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি টাকা সাদা হয়েছে ২০০৭ ও ২০০৮ সালের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। ওই সময় ৩২ হাজার ৫৫৮ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এই সুযোগ নিয়েছিল।

তখন ৯ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা বৈধ করা হয়, যা এ পর্যন্ত যত টাকা বৈধ হয়েছে তার অর্ধেকের বেশি।

গত অর্থবছরে মতো আসছে অর্থবছরেও নিয়মিত কর দিয়ে সব খাতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখার কথা শোনা যাচ্ছে। শুধু চলতি বাজেটের জন্য ১০ শতাংশ কর দিয়ে জমি, ভবন ও অ্যাপার্টমেন্টের পাশাপাশি নগদ অর্থ, ব্যাংকে সঞ্চিত অর্থ, সঞ্চয়পত্র, বন্ড ও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করে রিটার্নে দেখানোর সুযোগ দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে সরকারের কোনো সংস্থা কোনো প্রশ্ন করবে না বলেও জানানো হয়। এ সুযোগ নিয়ে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আট হাজার ৩৩৩ জন এবং এপ্রিল পর্যন্ত ১০ হাজারের বেশি করদাতা কালো টাকা সাদা করেছে।

এনবিআর সূত্র জানায়, দুই শতাধিক ব্যক্তি ১০ শতাংশ কর দিয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের বিপরীতে ২৬০ কোটি টাকা সাদা করায় এনবিআর কর পেয়েছে ২৬ কোটি টাকা। জমি কেনার মাধ্যমে এক হাজার ৫০০ করদাতা কালো টাকা সাদা করায় এনবিআর কর পেয়েছে ১২৪ কোটি টাকা। অ্যাপার্টমেন্ট কিনে দুই হাজার ৬০০ করদাতা কালো টাকা সাদা করায় কর আদায় হয়েছে ১২২ কোটি টাকা, ছয় হাজারের বেশি করদাতা নগদ অর্থ, ব্যাংক আমানত ও অন্যান্য আর্থিক স্কিমে বিনিয়োগের মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করায় এক হাজার ১০০ কোটি টাকার বেশি কর আদায় হয়েছে। এভাবে মোট সাদা হয়েছে ১১ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here