দেশে চালের বাজার আবার অস্থির হয়ে উঠেছে

দেশে চালের বাজার আবার অস্থির হয়ে উঠেছে। ব্যবসায়ীদের অতিমুনাফার লোভ বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে, বলছে সংশ্লিষ্ট মহল। অন্যদিকে ভোক্তা ও সাধারণ মানুষ মনে করছে, সরকারের সঠিক মনিটরিংয়ের ঘাটতি, পর্যাপ্ত তথ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে বাজারে এমন পরিস্থিত বারবার তৈরি হয়।

চালের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে ধানের দাম বেশির অজুহাত দিচ্ছেন ধান-চালের আড়তদার, ব্যবসায়ী ও মিল মালিকরা। তবে এ অজুহাত যৌক্তিক নয় বলে দাবি করেছে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

কৃষি সম্প্রসারণ ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর মাঠ ফসলের তথ্য বলছে, গত অর্থবছর (২০১৯-২০) আউশ, আমন ও বোরো—এ তিন মৌসুমে যে ধান উৎপাদন হয়েছে তা থেকে চাল উৎপাদন হয়েছে তিন কোটি ৮৬ লাখ মেট্রিক টন। ওই বছর দেশের চাল উৎপাদনের লক্ষ্য ছিল তিন কোটি ৮৭ লাখ টন।

আর সর্বশেষ ধানের মৌসুম ছিল গত মে-জুনে বোরোর। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ওই মৌসুমে দেশে চাল উৎপাদন ছিল দুই কোটি এক লাখ টনের ওপরে। এ সময় লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই কোটি চার লাখ টন।

অথচ কুষ্টিয়া ও নওগাঁসহ মোকামগুলোতে ঘুরে ধানের সরবরাহ কম এবং গত বছরের তুলনায় দামও কিছুটা বেশিই দেখা গেছে। প্রশ্ন হলো, হঠাৎ ধানের দাম কেন বাড়ল।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আসাদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঘাটতির কারণে ধানের দাম বাড়া যৌক্তিক নয়। কারণ গত বোরো মৌসুমে ধান উৎপাদন ছিল আশানুরূপ। চলতি আমন মৌসুমেও ধানের উৎপাদন খুব বেশি কম হবে না।’ তিনি জানান, চলতি আমন মৌসুমে উৎপাদন লক্ষ্য ধরা হয়েছে এক কোটি ৫৬ লাখ টন। এর মধ্যে চার দফা বন্যায় কুড়িগ্রামসহ কিছু অঞ্চলে ধানের ক্ষতি হয়েছে। এতে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আড়াই থেকে তিন লাখ টন ধান কম উৎপাদন হতে পারে। তবে সেটার প্রভাব এখন পড়ার কথা নয়। কারণ আমন মৌসুম এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। আমনের আবাদ জুলাইতে শুরু হয়ে কাটা শেষ হয় ডিসেম্বরে। আর আগামী বোরো মৌসুমে তাঁদের হিসাবে চার লাখ টন ধান উৎপাদন বাড়বে। সে হিসাবে এ ঘাটতিও থাকবে না বলেই আশা করছেন তাঁরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলছেন, তার পরও কেন ধানের দাম বাড়ছে, সেটা বাজারের সঙ্গে সম্পর্কিতরাই বলতে পারবেন।

মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে কৃষকদের হাতে বোরো বা আমন কোনো ধানই তেমন নেই। মৌসুমের শুরুতেই তাঁরা উৎপাদন খরচের বকেয়া পরিশোধ করতে ধান বিক্রি করে দিয়েছেন। ফলে ধান চলে গেছে মধ্যস্বত্বভোগী আড়তদার ও মিল মালিকদের কাছে। ধানের দাম বাড়ছে তাঁদের ইচ্ছামতো। ধানের দামের সঙ্গে সমন্বয়ের যুক্তিতে বাড়ানো হচ্ছে চালের দামও। আড়তদার ও মিল মালিকদের কাছে কী পরিমাণ ধান মজুদ রয়েছে তা প্রশাসনের কর্মকর্তা মনিটর করলেই কেবল বোঝা যাবে।

অবশ্য মিলাররা বলছেন, আমন মৌসুমে ধানের উৎপাদন কম হয়েছে। ধান মজুদ করেছে একশ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী। সে কারণে গত এক সপ্তাহে চালের দাম নতুন করে কেজিতে চার-পাঁচ টাকা বেড়েছে। ভোক্তা ও সাধারণ বিক্রেতাদের শঙ্কা এভাবে বাড়তে থাকলে আগামী দু-এক সপ্তাহের মধ্যে দাম বৃদ্ধি আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। এর আগে ২০১৭ সালে সিলেট ও সুনামগঞ্জসহ হাওরে আগাম বন্যায় ধান নষ্ট হলে চিকন চালের দাম ৭০ টাকা কেজি পর্যন্ত উঠেছিল। তখন আমদানি শুল্ক তুলে দিয়ে বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির অনুমতি দিতে হয়েছিল সরকারকে।

নওগাঁ ও কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন মোকামে গত এক সপ্তাহে ধানের দাম মণপ্রতি (৩৭.৩২ কেজি) বেড়েছে ১৫০ টাকা বা কেজিতে প্রায় চার টাকা পর্যন্ত। বর্তমানে কুষ্টিয়ার বাজারগুলোতে চিকন চালের ধান কাটারিভোগ-শম্পাকাটারি, জিরাশাইল, কাজললতা, আটাশসহ ধান বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৪৪০ থেকে এক হাজার ৪৫০ টাকা মণ, যা সপ্তাহখানেক আগে ছিল এক হাজার ২৮০ থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা। মৌসুমের শুরুতে এসব ধানের দাম ছিল ৭০০-৮০০ টাকা মণ।

ধানের সঙ্গে ওই সব মোকামে বেড়েছে চালের দামও। কুষ্টিয়ার খাজানগর মোকামে মিনিকেট চাল মিল গেটেই ৫৯-৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা কয়েক দিন আগেও ছিল ৫৩-৫৪ টাকায়। অর্থাৎ দাম বেড়েছে কেজিতে পাঁচ টাকা পর্যন্ত। এ অঞ্চলে মোটা চাল খুব একটা পাওয়া যাচ্ছে না।

এখানকার লিয়াকত রাইস মিলের মালিক লিয়াকত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, বর্তমানে ধানের দাম প্রতি মণে ১০০-১৫০ টাকা বেড়েছে। সেই কারণে চালের দাম মিল গেটে বেড়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে বর্তমানে মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে কেজি ৬২-৬৬ টাকা দরে, এক সপ্তাহ আগে যা ছিল ৫৮-৬২ টাকা। আর দুই সপ্তাহ আগে ছিল ৫৪-৬০ টাকা। ৫৪-৫৮ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে ব্রি-২৮ ও পাইজামসহ মাঝারি মানের চাল, যা আগের সপ্তাহে ছিল ৫০-৫২ টাকা এবং দুই সপ্তাহ আগে ছিল ৪৮-৫০ টাকা। মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৬-৫০ টাকা কেজি। এক সপ্তাহ আগে ছিল ৪৪-৪৬ টাকা, আর দুই সপ্তাহ আগে ছিল ৪২-৪৫ টাকা।

নওগাঁর বাজারগুলোতে গত সপ্তাহের তুলনায় স্বর্ণা-৫ জাতের চাল ৪২ টাকা থেকে বেড়ে ৪৬ টাকা, আটাশ ৪৮ থেকে বেড়ে ৫২ টাকা, জিরাশাইল ৫২ থেকে বেড়ে ৫৬ টাকা ও কাটারিভোগ-শম্পাকাটারি ৫৬ টাকা থেকে বেড়ে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

চালকল মালিক সমিতির একাংশের সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ধানের দাম বাড়ায় চালের দাম কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়েছে। বাজারে হটকারিতা বন্ধে সরকারকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, না হলে ধানের এই বাজারের লাগাম টেনে ধরা যাবে না।’

নওগাঁ ধান-চাল আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নিরোদ বরণ সাহা চন্দন বলেন, ‘দীর্ঘস্থায়ী বন্যা আর বন্যার কারণে আমনের উৎপাদন কম হওয়ায় বাজারে প্রভাব পড়েছে। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, ২০-২৫ লাখ টন ধানের উৎপাদন কম হয়েছে। সে হিসাবে চালের উৎপাদনও কম হয়েছে।’

কিন্তু কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. ইউসুফ কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ‘বোরো মৌসুম শেষ হয়েছে বেশি দিন হয়নি। আমন মৌসুমেও ধান উৎপাদন কম হয়নি। ফলে এখন চালের দাম বাড়ার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। মিলাররা যে কারণ দেখাচ্ছেন তা হলো ধানের দাম বেড়েছে। ধানের দামও তারাই কৃত্রিমভাবে বাড়িয়েছেন। আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে, বড় বড় মিলাররা প্রচুর ধান মজুদ করেছেন। এখন ধানের দাম বাড়ানোর জন্য তাঁরা সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন। সরকারি নিয়মে যেহেতু নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি মজুদ করতে পারেন, তাই তাঁরা ভিন্ন কৌশল নিয়েছেন। বড় বড় কৃষকের কাছে ধান মজুদ করেছেন তাঁরা। এ ছাড়া কিছু কিছু আড়তদার বা মধ্যস্বত্বভোগীর কাছেও ধান আটকা পড়েছে।’

এসব বিষয় মনিটরিং ও চালের যৌক্তিক দাম নির্ধারণের জন্য এরই মধ্যে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিবকে প্রধান করে একটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটি আগামী এক মাসের মধ্যে চালের যৌক্তিক দাম, বর্তমানে অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার কারণ ও ধানের মজুদ ইত্যাদি বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করবে। কমিটিতে খাদ্য মন্ত্রণালয় ছাড়াও কৃষি মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের প্রতিনিধিরা রয়েছেন।

কমিটি করার আরো একটি কারণ হলো মনিটরিংয়ে সমন্বয় করা। কৃষকের কাছে ধান থাকলে কৃষি মন্ত্রণালয় মনিটর করবে। কিন্তু এটা কঠিন বিষয়। কারণ কৃষকের কাছে ধান থাকলে সেটাকে মজুদ বলা যায় না। বাজারে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়লে সেটা ভোক্তা অধিদপ্তর মনিটর করবে। আর মিলারদের কাছে থাকলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দেখার দায়িত্ব।

গত আগস্টে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, চালের উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩.৫৪ শতাংশ বেড়েছে। তাদের গবেষণা অনুসারে, আগের বোরো ও আমন মৌসুমের উদ্বৃত্ত উৎপাদন থেকে হিসাব করে গত জুন পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে দুই কোটি ৩১ লাখ টন (২০.৩১ মিলিয়ন) চাল ছিল। নভেম্বর পর্যন্ত চাহিদা মেটানোর পরও ৫৫ লাখ ৫০ হাজার (৫.৫৫ মিলিয়ন) টন চাল দেশের অভ্যন্তরে উদ্বৃত্ত থাকবে, যা দিয়ে পরবর্তী ৩৬-৭৮ দিন চাহিদা পূরণ করা যাবে। এর মধ্যে দেশের খাদ্য মজুদে নতুনভাবে আমন ও আউশের উৎপাদন যুক্ত হবে। ফলে দেশে আপাতত খাদ্য ঘাটতির কোনো আশঙ্কা নেই। ব্রি মধ্য এপ্রিল থেকে মধ্য জুলাই পর্যন্ত পাঁচটি গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।

কিন্তু তার পরও ধানের সংকট দেখা যাচ্ছে বাজারগুলোতে। ফলে চালের দামও বাড়ছে হু হু করে। বাধ্য হয়ে সরকার চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরই মধ্যে এক লাখ টন চাল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে সরকারের একটি সূত্রে জানা যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here