তিন দশকেও বায়িং হাউজের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়নি

স্টাফ রিপোর্টার : দেশে বায়িং হাউজ ব্যবসা চালু হয় প্রায় তিন দশক আগে। এ দীর্ঘ সময়েও কোনো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়নি ব্যবসাটির ওপর। বায়িং হাউজগুলোর নিবন্ধনে আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠানই তা মানছে না। এ অবস্থায় অনিবন্ধিত বায়িং হাউজগুলোকে ৬০ দিনের মধ্যে নিবন্ধন গ্রহণের নির্দেশনা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। এ সময়ের মধ্যে নিবন্ধন গ্রহণে ব্যর্থ হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে।

দেশে রফতানিমুখী পোশাক শিল্পের যাত্রা আশির দশকে। শুরুতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাগোষ্ঠীর সঙ্গে সংযোগ তৈরি ও দরকষাকষিতে খুব একটা পারদর্শী ছিলেন না পোশাক শিল্পমালিকরা। এ সুযোগে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উত্থান ঘটে বায়িং হাউজ ব্যবসার। এর ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বা তদারকি না থাকায় অনেক ধরনের সমস্যা দেখা দেয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, দেশের বায়িং হাউজগুলোয় বিপুল পরিমাণ বিদেশী কাজ করেন, যাদের কারণে প্রচুর অর্থ দেশের বাইরে চলে যায়। কূটকৌশল অবলম্বনের কারণে এ অর্থের বেশির ভাগটাই যায় অবৈধ পন্থায়।

আবার বায়িং হাউজের গাফিলতিতে পণ্য প্রস্তুতকারক কারখানা কর্তৃপক্ষ ও ক্রেতার মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এতে করে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু সমস্যার মূলে থাকা বায়িং হাউজকে কোনো জবাবদিহিতায় আনা সম্ভব হয় না।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বস্ত্র শিল্প আইন ২০১৮ প্রণয়ন করে সরকার। বায়িং হাউজের নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতাও ওই আইনের মাধ্যমেই সৃষ্টি হয়।

আইনে বলা হয়, পোশাক শিল্পের বায়িং হাউজ, ব্র্যান্ড ও অন্য ক্রেতাদের লিয়াজোঁ কার্যালয় থেকে শুরু করে শিল্পসংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোকে বস্ত্র অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন গ্রহণ করতে হবে। এজন্য বায়িং হাউজগুলোকে নিবন্ধনের আহ্বান জানিয়ে চলতি বছরের এপ্রিলে একটি প্রজ্ঞাপনও জারি করা হয়।

ওই প্রজ্ঞাপন জারির পর প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত নিবন্ধন নিয়েছে মাত্র ৮-১০টি প্রতিষ্ঠান। এ প্রেক্ষাপটে নতুন করে আরেকটি প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে, যাতে নিবন্ধন গ্রহণের সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে ৬০ দিন।

২৮ মে জারি করা ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বায়িং হাউজগুলোকে এটি জারির দিন থেকে ৬০ দিনের মধ্যে নিবন্ধন গ্রহণ করতে হবে। উপযুক্ত কারণ দেখাতে পারলে নিবন্ধক অতিরিক্ত ৬০ দিন সময় বাড়াতে পারবে। এ সময়ের মধ্যে নিবন্ধন গ্রহণে ব্যর্থ হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে সরকার।

রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপনটি বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বস্ত্র খাতসংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি মোট ৭০টি সংস্থা ও সংগঠনের কাছে পাঠানো হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনের বিষয়ে জানতে চাইলে বস্ত্র অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, খাতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষেই প্রজ্ঞাপনটি জারি করা হয়েছে। অনেক ব্যক্তি রয়েছেন, যারা স্বল্প সময়ের জন্য নামসর্বস্ব ভুইফোঁড় বায়িং হাউজের নামে ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি পরিচালনায় সম্পৃক্ত হয়। অনেকে ক্ষেত্রে এ ধরনের বায়িং হাউজের ব্যবসার সময় তিন মাসেরও কম হয়ে থাকে। এ কারণেই সময়টি ৬০ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। এ প্রজ্ঞাপনটি বাংলাদেশ ব্যাংকেও পাঠানো হয়েছে, যাতে করে ব্যাংকের মাধ্যমে অনিবন্ধিত বায়িং হাউজ শনাক্ত করা যায়। নিবন্ধন না নিলে কোনো বায়িং হাউজ ব্যবসা করতে পারবে না।

৬০ দিনের বাধ্যবাধকতা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ গার্মেন্ট বায়িং হাউজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিবিএ) সভাপতি কেআই হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, সরকার আইন ও আইনের আলোকে প্রজ্ঞাপন জারি করলেও নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতার বিষয়টি বহুল প্রচারিত হতে পারেনি। তাই কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে নিবন্ধন এখনো হয়নি। গত কয়েক দশকে কোনো অভিভাবক ছাড়াই বস্ত্র ও পোশাক শিল্প বড় হয়েছে। এখন একটি পোশাক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে শিল্পটি অভিভাবক পেয়েছে। এর আওতায় বায়িং হাউজগুলোও অন্তর্ভুক্ত। খাতের স্বচ্ছতা ও জাতীয় রাজস্বের স্বার্থে ইতিবাচক এ পদক্ষেপ কার্যকর হওয়া প্রয়োজন। দুঃখজনক হলেও সত্য, আইন থাকলেও এখনো এ খাতে নিয়ন্ত্রণ বা তদারকি পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা পায়নি। তবে ধীরে হলেও সচেতনতা বাড়ছে। বেশকিছু প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধন নিতে সংগঠনের পক্ষ থেকে সুপারিশও করা হয়েছে।

জানা গেছে, বিজিবিএর সদস্য বায়িং হাউজ সক্রিয় রয়েছে প্রায় ৪০০। এছাড়া রয়েছে বিদেশী ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের লিয়াজোঁ অফিস। বিজিএমইএ সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশে ব্র্যান্ড ক্রেতাদের লিয়াজোঁ দপ্তর হিসেবে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় এক-দেড়শো। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে এইচঅ্যান্ডএম, সিঅ্যান্ডএ, লিঅ্যান্ডফাং, মার্কস অ্যান্ড স্পেনসার, ইন্ডিটেক্স, গ্যাপ, জেসিপেনিসহ আরো বহু বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড। এসব প্রতিষ্ঠানকেও বস্ত্র অধিদপ্তরের নিবন্ধন নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। অন্যদিকে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য মতে, ২০০৯-২০১৮ সালের মধ্যে সব খাত মিলিয়ে অনুমোদিত লিয়াজোঁ অফিসের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ১০০।

সূত্র জানিয়েছে, আগে বিলুপ্ত বিনিয়োগ বোর্ড থেকে অনুমোদন নিয়ে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের লিয়াজোঁ কার্যালয়গুলো পরিচালনা করত। সুনির্দিষ্ট কোনো পোশাক কর্তৃপক্ষ না থাকায় বিনিয়োগ বোর্ডে ৫০ হাজার ডলার জমা দিয়ে লিয়াজোঁ অফিস হিসেবে অনুমোদন নিতে হতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে। নতুন আইনের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী এসব লিয়াজোঁ কার্যালয়কে বস্ত্র অধিদপ্তরের নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে।

পোশাক শিল্প প্রতিনিধিরা বলছেন, বায়িং হাউজের মতো মধ্যস্থতাকারীর কারণে আয়ের একটি বড় অংশ চলে যায় অন্যের পকেটে। যদিও শুরুর দিকে শিল্পটির বিকাশের স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বায়িং হাউজগুলো। কিন্তু এখন পোশাক খাতের কারখানা মালিকদের সরাসরি ক্রেতার সঙ্গে বিপণন সংযোগ ও দরকষাকষির কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here