টিকে থাকার লড়াইয়ে স্ক্রিন প্রিন্ট ব্যবসা

রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস শিল্পকে কেন্দ্র করে রাজধানীর মিরপুর, কেরানিগঞ্জ, আশুলিয়া, সাভার এবং গাজীপুরের টঙ্গীতে গড়ে উঠেছে স্ক্রিন প্রিন্টের এরকম আরো অনেক প্রতিষ্ঠান। কোভিডের কারণে গার্মেন্টস শিল্পে মন্দার কারণে থমকে গেছে স্ক্রিন প্রিন্টের ব্যবসাও।

মিরপুর দুয়ারীপাড়ার এসঅ্যান্ডএস প্রিন্ট নামের প্রতিষ্ঠানটি গার্মেন্টসের জন্য কাপড় প্রিন্টের কাজ করে আসছে গত এক দশক ধরে। কোভিডের কারণে অর্ডার কমে যাওয়ায় বিপদে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। এসময় খরচ কমানোর জন্য কর্মী ছাঁটাই করে টিকে থাকার চেষ্টা করেন প্রতিষ্ঠানটির মালিক আব্দুল আজিজ।

তাতেও কাজ হয়নি। শেষ পর্যন্ত আর না পেরে গত নভেম্বরে লোকসান দিয়েই প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করে দেন তিনি।

প্রতিষ্ঠানটি কিনে এখন বিপদে আছেন নতুন মালিক সুমন সাহাও। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে তিনি বলেন, ‘গতমাসে প্রতিষ্ঠানটি কিনেছি। বেশ কিছুদিন এটা বন্ধ ছিল। এজন্য তুলনামূলক কম দামে কিনতে পেরেছি। কিন্তু এখন তো কোনো কাজই পাচ্ছি না।

তিনি বলেন, ‘বায়িং হাউজ বা সরাসরি গার্মেন্টস থেকে কাজ পাওয়ার আশা করেছিলাম। কিন্তু সেরকম কোনো কাজ পাচ্ছি না। এখন স্থানীয় কিছু প্রতিষ্ঠানের অল্প কিছু কাজ আছে হাতে। অর্ডার কম থাকায় ৪৫ জন কর্মচারির মধ্যে ১৭ জনকে রেখেছি। আপাতত টিকে থাকার চেষ্টায় আছি।’

রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস শিল্পকে কেন্দ্র করে রাজধানীর মিরপুর, কেরানিগঞ্জ, আশুলিয়া, সাভার এবং গাজীপুরের টঙ্গীতে গড়ে উঠেছে স্ক্রিন প্রিন্টের এরকম আরো অনেক প্রতিষ্ঠান। কোভিডের কারণে গার্মেন্টস শিল্পে মন্দার কারণে থমকে গেছে স্ক্রিন প্রিন্টের ব্যবসাও। ম্যানুয়ালি কাপড় প্রিন্ট করার জনপ্রিয় এই পদ্ধতি এখন কোনোভাবে টিকে থাকার লড়াইয়ে আছে।

শিয়ালবাড়ীর সিলভার স্টোন স্ক্রিন প্রিন্টের সুপারভাইজার এবিএম সাগর টিবিএসকে বলেন, ‘আমাদের কাজ প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। লোকাল কাজও খুব একটা নেই। ২০১৭ সালে ব্যবসা চালুর পর এতো বড় সংকটে আর কখনো পড়িনি। এ অবস্থা চলতে থাকলে কারখানাই বন্ধ করে দিতে হবে।’

২০১৩ সালে এসএমই ফাউন্ডেশন মিরপুরের ৫ শতাধিক স্ক্রিন প্রিন্ট প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে একটি ক্লাস্টার ঘোষণা করে। মিরপুরের রুপনগর এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, স্ক্রিন প্রিন্টের অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান বন্ধ। যেগুলো চালু আছে, তাতেও কাজ চলছে সীমিত আকারে। কমবেশি সব প্রতিষ্ঠানই কর্মী ছাঁটাই করেছে।

কিছু প্রতিষ্ঠান চালু আছে চুক্তিভিক্তিক শ্রমিক দিয়ে। অর্ডার থাকলে শ্রমিকদের ডাকা নয়, না থাকলে বেকার। যারা কাজের ডাক পান, তাদের মজুরিও কমে গেছে।

দুয়ারীপাড়ায় ডট সাইন নামের কারখানায় গিয়ে দেখা গেছে, ইতালিয়ান একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য কাপড় প্রিন্ট করছে তারা। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আগে মাসে প্রায় দুই লাখের মতো কাপড় প্রিন্টের অর্ডার পেতাম। এখন পাই ৫০ হাজার বা তারও কম। বাধ্য হয়ে নিয়মিত কর্মীদের একটা অংশকে চুক্তিভিক্তিক কাজ করাচ্ছি।’

ব্যবসায়ীরা বলেছেন, রপ্তানিমুখী পোশাকের প্রিন্ট অর্ডার কমে যাওয়ায় তাদের সংকট তীব্র হচ্ছে। স্থানীয় বাজারের জন্য পোশাক প্রিন্ট থেকে যে আয় হয়- তাতে ভাড়া ও অন্যান্য সংস্থাপক খরচ দিতেই হিমসিম খেতে হচ্ছে। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে অনেকে প্রতিষ্ঠান সচল রেখেছেন।

স্ক্রিন প্রিন্টের ব্যবসায় মন্দার কারণে চাকরি হারিয়েছেন বহু শ্রমিক। দুয়ারীপাড়া বাজারে কথা হয় এমন এক তরুণ শ্রমিক নাজিম উদ্দিনের সঙ্গে। কারখানায় চাকুরি হারিয়ে এখন সবজি বিক্রি করেন তিনি।

নাজিম উদ্দিন জানান, শাটডাউনের সময় কিশোরগঞ্জে গ্রামের বাড়ীতে চলে গিয়েছিলেন। সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি শেষে এসে কারখানা মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মালিক জানান, কারখানা কবে খুলবে ঠিক নেই। বাধ্য হয়ে সবজি বিক্রিতে নামেন তিনি।

স্ক্রিন প্রিন্ট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব সাইফুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, রপ্তানিমুখী পোশাকের স্ক্রিন প্রিন্টের অর্ডার না পেলে এখাতের তিন হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান আদৌ টিকে থাকতে পারবে কীনা- তা নিয়েই সংশয় আছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here