চীনারাই সোনার দাম নিয়ে খেলছেন

করোনাভাইরাসের টিকা আসার সুসংবাদ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে জটিলতা নিরসনের পর বৈশ্বিক জ্বালানি তেল ও শেয়ারবাজার মোটামুটি স্থিতিশীল আছে। তবে সোনার দাম নভেম্বরের শেষে কমলেও আবার বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আমার ধারণা, প্রতি আউন্স (৩১.১০৩৪৭৬৮ গ্রাম) সোনার দাম ২ হাজার ২০০ মার্কিন ডলারে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা ছিল। সে কারণে অনেকেই সোনার পেছনে বিনিয়োগ করেছিলেন। হঠাৎ করে দরপতনের কারণে তাঁরাই এখন দামটা একটু বাড়িয়ে বিনিয়োগকৃত টাকা ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করছেন। মূলত চীনা বিনিয়োগকারীরাই সোনার দাম নিয়ে খেলছেন।

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকলে দেশেও দাম বাড়াতে হবে। বর্তমানে বৈশ্বিক যে দাম, তাতে আমাদের দেশে সোনার দাম ভরিতে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পেছনে রয়েছে। মূলত আমরা সমিতির তরফ থেকে প্রতি সোমবার বৈশ্বিক বাজার পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি। তবে দাম দ্রুত বাড়তে থাকলে তার আগেই তা সমন্বয় করা হতে পারে, মানে যেকোনো সময় দেশেও দাম বাড়তে পারে।ভেম্বরের শেষ দিকে বিশ্ববাজারে দাম নিম্নমুখী থাকায় ২ ডিসেম্বর দেশে সোনার দাম ভরিতে কমানো হয় ১ হাজার ১৬৬ টাকা। তার আগে ২৫ নভেম্বর কমানো হয়েছিল আড়াই হাজার টাকা। বর্তমানে ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার অলংকার কিনতে লাগছে ৭২ হাজার ৬৬৭ টাকা।

এদিকে দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকায় বিদেশ থেকে দেশে ফেরার সময় প্রবাসী বাংলাদেশিদের সোনার বার আনার ক্ষেত্রে একের পর এক রেকর্ড হচ্ছে। বৈধ পথে ব্যাগেজ রুলের আওতায় সরকারকে নির্ধারিত হারে কর দিয়ে বিপুল পরিমাণ সোনার বার আনছেন প্রবাসীরা। গত নভেম্বর মাসে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে প্রায় এক টনের সমপরিমাণ সোনার বার এসেছে। পাঁচ হাজার যাত্রী এসব সোনার বার এনেছেন। বাজারমূল্যে এসব সোনার বারের দাম প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা।

দেশে হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ সোনার বার আসাটা আমার কাছে গোলমেলে লাগছে। কারণ, দেশের জুয়েলার্স ব্যবসায় এত সোনার চাহিদা নেই। তা ছাড়া প্রবাসীরা দেশে আসার সময় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার সোনার বার আনছেন। অধিকাংশ শ্রমিকের এত টাকা বিনিয়োগ করার সক্ষমতা নেই। আগে কখনোই প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে এমন প্রবণতা দেখিনি বলেই আমাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। বিদেশ থেকে এত সোনার বার এলেও তা আমাদের জুয়েলার্স ব্যবসায়ীদের কাছে আসছে না।

বিয়েশাদির কারণে জুয়েলার্সের ব্র্যান্ডের বিক্রয়কেন্দ্রে ভিড় বেড়েছে। তবে অত্যধিক দামের কারণে যেটুকু না হলেই নয়, সেটুকু ক্রয়াদেশ দিচ্ছেন ক্রেতারা। তাতে মুনাফা কমে গেছে। সব মিলিয়ে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কায় ব্যবসা আবারও বিপর্যস্ত। সোনার দাম যদি ভরিতে ৪০ হাজার টাকায় নেমে আসে, তাহলেই ব্যবসা চাঙা হবে।

গত ৬ আগস্ট আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স (৩১.১০৩৪৭৬৮ গ্রাম) সোনার দাম ২ হাজার ৭০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। সেই প্রতি ভরির দাম গিয়ে ৭৭ হাজার ২১৬ টাকায় দাঁড়ায়। সেটিই ছিল দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ দাম। গত ৩০ নভেম্বর বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম কমে হয়েছিল ১ হাজার ৭৭৭ ডলার। তারপর থেকেই আবার দাম বাড়ছে। আজ বুধবার সোনার দাম ছিল ১ হাজার ৮৬০ ডলার।

সোনার বাজার অস্থির থাকায় প্রয়োজন না হলে বর্তমানে সাধারণ মানুষের বিনিয়োগ না করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। বরং দাম আরেকটু যদি বাড়ে তাহলে পুরোনো অলংকার বিক্রি করে দেওয়া ভালো। তাতে মুনাফা মিলবে। আমার অভিজ্ঞতা বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে প্রতি আউন্স সোনার দাম কমে ১ হাজার ৪০০ ডলার হবে। কারণ, বেলুন ফুলতে ফুলতে শেষ পর্যায়ে ফেটে যায়। সোনার ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই হতে যাচ্ছে। সোনার দাম ইতিমধ্যেই অতিমূল্যায়িত হয়ে গেছে।

বৈধভাবে সোনা আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও নানামুখী জটিলতার কারণে পর্যাপ্ত পরিমাণে আনতে পারছে না লাইসেন্স পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো। তাতে বাজারে কোনো প্রভাব পড়ছে না। তবে বৈধভাবে সোনা আমদানি সহজ হলে দেশের মানুষ আন্তর্জাতিক মূল্যের কাছাকাছি দামে কিনতে পারবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here