কৃষি যন্ত্রাংশ উৎপাদনে নেতৃত্ব দিচ্ছে যশোর

সিনিয়র রিপোর্টার : আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে যশোরে এখন উৎপাদিত হচ্ছে গাড়িরপার্টস, স্প্রিংপাতি ও বডি থেকে শুরু করে নানা যন্ত্রাংশ। এসব উৎপাদিত পার্টস ব্যবহার করছেন দেশের প্রতিষ্ঠিত পরিবহন ও স্থানীয় রুটের গাড়ি ব্যবসায়ীরা একই সঙ্গে যশোরে তৈরি হচ্ছে পাথর ও ইট ভাঙার মেশিন। এরই মধ্যে পাথর ভাঙা মেশিন ভারতে রফতানি শুরু করেছেন উদ্যোক্তারা।সব মিলিয়ে বাজারটির আকার হাজার কোটি টাকা বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।যশোরের গাড়ির পার্টস উৎপাদনকারীদের মধ্যে অন্যতম এনায়েত ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানা। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. আক্তার হোসেন জানান, বিসিক শিল্পনগরীতে ২০১১ সালে এক বিঘা জমির ওপর কারখানা গড়ে তোলা হয়। কারখানায় ৫০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। এখানেশতাধিক গাড়ির পার্টস উৎপাদন করা হয়।যার মধ্যে রয়েছে গাড়ির ব্রেক ড্রাম, পেসার প্লেট, গিয়ার বক্স, ব্রেক ডিস্ক, ইঞ্জিন হাউজিং, হ্যাঙ্গার,  গিয়ার বক্সের বডি ইত্যাদি। এসব পার্টস সর্বনিম্ন ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।সব ধরনের গাড়ির ড্রাম যাচ্ছে সারা দেশে।স্বনামধন্য পরিবহন ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে স্থানীয় রুটের গাড়ির মালিকরা এসব পার্টস ব্যবহার করছেন।তিন বছর আগে শহরতলির উপশহর এলাকায় এসকে মেটাল ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলেন তরুণ উদ্যোক্তা  কামরুল হাসান সোহেল। বর্তমানে সেখানে পিকআপের স্প্রিংপাতি উৎপাদন হচ্ছে।এস পিকআপ, টিকিং পিকআপ, জেক ও আইশার পিকআপে ব্যবহার হচ্ছে এই স্প্রিংপাতি।প্রতি মাসে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার পিস স্প্রিংপাতি উৎপাদন করছে।এসকে মেটাল ইন্ডাস্ট্রির স্বত্বাধিকারী কামরুল হাসান সোহেল জানান, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ শেষে কিছুদিন  চাকরি করার পর চাকরি ছেড়ে তিন বছর আগে গড়ে তুলি প্রতিষ্ঠানটি।বর্তমানে কারখানায় নিজস্ব মেশিনে স্প্রিংপাতি উৎপাদিত হচ্ছে। এখানে ৫০ জন শ্রমিক কাজ করছেন।গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা পেলে স্প্রিংপাতির বাজার আরো বড় করা সম্ভব বলেও তিনি জানান।

১৯৯২ সালে যশোর শহরে মাত্র ১ হাজার ২০০ টাকা পুঁজি নিয়ে রিপন মেশিনারিজ নামে কৃষি পার্টসের ব্যবসা শুরু করেন আশরাফুল ইসলাম বাবু।এরপর ১৯৯৫ সালে রিপন ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ গড়ে তোলেন।বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন হচ্ছে স্টোন মিনি ক্রাশার, ইট ও পাথরভাঙা মেশিন, ইস্পলার,  প্রেসার পুলি, লাইনার স্লট প্লেট, পানির পাম্প, শ্যালো ইঞ্জিনের মেশিনসহ বিভিন্ন ধরনের মেশিনারিজ।ওই প্রতিষ্ঠানেরউৎপাদিত পাথর ভাঙা মেশিন ভারতেও রফতানি হচ্ছে। যশোর লাইট অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং মালিক সমিতির সভাপতি ও রিপন মেশিনারিজের স্বত্বাধিকারীআশরাফুল ইসলাম বাবু জানান, প্রতিমাসে তাদের উৎপাদিত ১৫টি পাথর ভাঙা মেশিন ভারতে     রফতানি করা হচ্ছে। যার প্রতিটির দাম সাড়ে ৪ লাখ টাকা। আর সারা দেশের বাজারেতাদের ইট ও পাথর ভাঙা মেশিনের বাজারও ভালো।শুধু রিপন ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ না, যশোরে অন্তত ৩০০ হালকা ও ভারী প্রকৌশলশিল্পপ্রতিষ্ঠান  রয়েছে বলে জানা গেছে।অগ্রণী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বত্বাধিকারী শমসের আলী বলেন, তাদের কারখানায় সরিষার তেল ভাঙানো মেশিন, বোতলজাতের জন্য ফিল্টারউৎপাদন হচ্ছে। তাদের পণ্য দেশের ৪০টি জেলায় যাচ্ছে। যশোর বিসিকে ভাই ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং উৎপাদন করছে টিউবওয়েল, বিচালি কাটামেশিন, বড় গাড়ির ড্রাম ও অটোবাইকের পার্টস। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী ইলিয়াস হোসেন জানান, তারা চট্টগ্রাম থেকে ভাঙ্গা জাহাজের লোহাকিনে এনে গলিয়ে পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। তিনি বলেন, সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ পাওয়া গেলে এ শিল্প আরো বিকশিত হতো।গাড়ির বডি নির্মাতা মো. শাহিন জানান, সারা দেশের প্রায় সব বড় গাড়ির বডি তৈরি হয় যশোরে।এখানে সনাতন পদ্ধতিতে বডি তৈরি করা হয়।স্বনামধন্য পরিবহন থেকে শুরু করে স্থানীয় রুটের গাড়ির বডি এখানকার কারিগররা তৈরি করেন।যার বাজার শতকোটি টাকা হবে।সরকারেরসহযোগিতা পেলে আরো উন্নত যন্ত্রপাতি এনে বডি তৈরি করা সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতি যশোর জেলা শাখার যুগ্ম সম্পাদক সিরাজ খান মিন্টু  জানান, জেলায় ৩০০টি হালকা ও ভারীশিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ২৫টি প্রতিষ্ঠান ভারী শিল্পপণ্য উৎপাদন করছে। যার মধ্যে রয়েছে পাথর ও খোয়া ভাঙা মেশিন, কৃষি যন্ত্রপাতিরপার্টস, রাইস মিলের যন্ত্রাংশ, বড় গাড়ির যন্ত্রাংশ ইত্যাদি। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বছরে হাজার কোটি টাকার পণ্য উৎপাদন করা হয়। তিনি বলেন,আমাদের সমিতির সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সহযোগিতা পেলে তারা আরো ভালো করতে সক্ষম হবে। এরই মধ্যে ভ্যাট আইন নিয়ে স্থানীয়এসব উৎপাদকের মধ্যে ভীতি কাজ করছে।যদি প্যাকেজ ভ্যাট উঠে যায়, তাহলে এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার আশংকায় রয়েছে।যশোরের ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প নিয়ে কাজ করা এনজিও আরআরএফের নির্বাহী পরিচালক ফিলিপ বিশ্বাস জানান, যশোরে অনেক আগে থেকেগাড়ির যন্ত্রাংশ উৎপাদন করা হয়।যার বাজার প্রায় হাজার কোটি টাকা। এখানকার উৎপাদিত যন্ত্রাংশের মান অনেক ভালো।এ ব্যাপারে যশোরচেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান খান জানান, যশোরের  ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পপ্রতিষ্ঠান অনেক আগে থেকে জাতীয়অর্থনীতিতে অবদান রাখছে।এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত যন্ত্রাংশ ভালো মানের।তবে তাদের আরো বিকশিত হতে হলে আন্তর্জাতিক বাজারখুঁজে বের করতে হবে।আর ব্যাংকগুলোকে এ শিল্পে ঋণ সুবিধা দিতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here