কর বহির্ভূত অর্থে বাড়ছে আবাসন খাত

কালো টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে মহামারির আঘাত পুষিয়ে নিয়ে গতি ফিরেছে রিয়েল এস্টেট খাতে।

মহামারির আঘাত পুষিয়ে নিয়ে ব্যবসা চালিয়ে রাখতে যখন অন্যান্য খাতের ব্যবসায়ীরা হিমশিম খাচ্ছেন, রিয়েল এস্টেট খাতের অনেক ব্যবসায়ীই ব্যবসায় ৫ -১০ শতাংশ লাভের মুখ দেখছেন। বেড়েছে ফ্ল্যাটের বিক্রিও। অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগের কথাও ভাবছে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) রিয়েল এস্টেট খাতে অন্তত ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে। এই অর্থ দিয়ে ফ্ল্যাট কিনেছেন ৩ হাজার ৫২০ জন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

আবাসন ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বাজেটে নির্ধারিত হারে কর দেয়া সাপেক্ষে বিনা প্রশ্নে কালো টাকা বিনিয়োগের সুবিধা দেয়ায় ফ্ল্যাট বিক্রি বেড়ে গেছে। ব্যাংক ঋণে সুদের হার এবং ভূমির রেজিস্ট্রেশন ফি কমানোর ইতিবাচক প্রভাবও পড়েছে এই খাতে। ফলে সব মিলিয়ে এই খাতে চলতি অর্থবছরে এ পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার মতো নতুন বিনিয়োগ এসেছে।

রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) প্রেসিডেন্ট আলমগীর শামসুল আলামিন বলেন, ‘নিজের প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আমাদের সংগঠনের সদস্যদের কাছ থেকে ফ্ল্যাট বিক্রি বৃদ্ধির তথ্য পাচ্ছি। বিনা প্রশ্নে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেয়ায় এই খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সব মিলিয়ে আবাসন খাত ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে।’

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ফ্ল্যাট বা প্লটে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ থেকে রাজস্ব বোর্ডের আয় হয়েছে ৩০২ কোটি টাকা।

বাজেট ঘোষণা অনুযায়ী ফ্ল্যাট কিনে কালোটাকা সাদা করতে চাইলে গুলশান, বনানী, বারিধারা, মতিঝিল ও দিলকুশার বাণিজ্যিক এলাকায় প্রতি বর্গমিটারের জন্য ৪ থেকে ৬ হাজার টাকা কর দিতে হয়।

ঢাকায় প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের হাউজিং সোসাইটি (ডিওএইচএস), ধানমন্ডি, মহাখালী, লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি, উত্তরা মডেল টাউন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, কারওয়ান বাজার, বিজয়নগর, নিকুঞ্জ, ওয়ারী ও সেগুনবাগিচা এবং চট্টগ্রামের খুলশী, আগ্রাবাদ, নাছিরাবাদে প্রতি বর্গমিটারে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা কর দিতে হবে। এসব এলাকার বাইরে যে কোনো সিটি কর্পোরেশনে প্রতি বর্গমিটারের জন্য কর দিতে হয় ৭০০ থেকে ১৩০০ টাকা।

ঢাকার গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরা, ধানমন্ডি, খিলক্ষেত এলাকার প্রজেক্টগুলোতে মহামারির মধ্যেও ব্যাপক সাড়া পাওয়ার কথা জানিয়েছে আবাসন খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান কনকর্ড। অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে কনকর্ডের অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি বেড়েছে ৮-১০ শতাংশ।

কনকর্ড রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক আলম “মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তিন মাস বাদ দিলে আমাদের ব্যবসা মোটামুটি স্বাভাবিকই ছিল। তবে গত দুই মাসেই ব্যবসায়ে বেশ ভালো আয় হয়েছে। ২০২১ সালের জন্য আমাদের বেশ কয়েকটি নতুন প্রকল্প পরিকল্পনাধীন আছে। নতুন বছরটিও ভালো যাবে বলেই মনে হচ্ছে।”

মহামারির মধ্যেই রাজধানীর শান্তিনগরে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণের প্রকল্পে হাতে নেয় আবেদ হোল্ডিংস লিমিটেড। ২০টি ফ্ল্যাটের এ প্রকল্পের প্রতিটি ফ্ল্যাটের মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। গত সাত মাসেই প্রতিষ্ঠানটির অর্ধেকের বেশি ফ্ল্যাট বিক্রি হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির চলমান ও আসন্ন ৮টি প্রকল্পের মোট অ্যাপার্টমেন্টের সংখ্যা ৫৫০টি। সব প্রকল্পেই ইতিবাচক ব্যবসা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মকর্তা।

আবেদ হোল্ডিংসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম বরকতুল্লাহ বলেন, “কোভিডের কারণে সবাই সমস্যায় পড়েছেন। আমরা গ্রাহকদের চাপ দেইনি। যে সব ফ্ল্যাটের ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছে তাও পরবর্তীতে বিক্রি হয়েছে। নতুন প্রকল্পেও দারুণ সাড়া পেয়েছি। অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেয়ার প্রভাব পড়েছে হয়তো এক্ষেত্রে।।”

পরিবেশবান্ধব ও অত্যাধুনিক ফ্ল্যাট বিক্রির জন্য পরিচিত প্রতিষ্ঠান বিল্ডিং টেকনোলজিস অ্যান্ড আইডিয়াস লিমিটেড (বিটিআই) মহামারির প্রভাব কাটিয়ে সেপ্টেম্বর থেকে ফ্ল্যাট বিক্রি ৫-১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।

বিল্ডিং টেকনোলজিস অ্যান্ড আইডিয়াস লিমিটেডের (বিটিআই) চিফ অপারেটিং অফিসার মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন , গত সেপ্টেম্বর মাস থেকেই ফ্ল্যাট বিক্রি বেড়ে গেছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বিক্রির হার বেড়েছে ৫ – ১০ শতাংশ।

“কালো টাকা ব্যবহারের অনুমতি আমার কাছে বড় কোনো বিষয় নয়। বিগত বছরগুলোতেও একই পরিস্থিতিই ছিল। এবছর রেজিস্ট্রেশনের খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ার কারণেই হয়তো মানুষ ফ্ল্যাট কিনতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। এছাড়াও ব্যাংকের সুদের হার কম হওয়ায় মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখার চেয়ে সম্পত্তির ক্ষেত্রেই অর্থ বিনিয়োগ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন।” বলেন তিনি।

রাজধানীর বনানী, গুলশান, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকায় আবাসন খাতের বড় প্রতিষ্ঠান শেলটেকের ১৫টি নতুন প্রকল্প চলমান।

প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয় বিভাগ থেকে জানানো হয়, প্রতি মাসে অন্তত ৩০টি ফ্ল্যাট বিক্রি হয়, যাতে লেনদেনের পরিমাণ ৭০-৮০ কোটি টাকা। তবে গত মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত চার মাসে একটি ফ্লাটও বিক্রি হয়নি তাদের। জুলাই-আগস্টে মাসে ধীরগতিতে বিক্রি শুরু হয়েছে। সেপ্টেম্বর থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে তাদের ব্যবসা। অক্টোবর এবং নভেম্বর মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আরও বেশি বিক্রি হয়।

শেলটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভির আহমেদ  বলেন, মার্চ-এপ্রিলে ৭০-৭৫ শতাংশ গ্রাহক কিস্তির টাকা পরিশোধ করেননি। বিগত কয়েক মাসে ক্ষতি পুষিয়ে উঠেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে ফ্ল্যাট বিক্রি আগের অবস্থায় ফিরে যেতে আরো কিছুদিন সময় লাগবে।

নাভানা রিয়েল এস্টেটের ৭৭টি চলমান প্রকল্পে ২০ হাজারের বেশি অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণের কাজ চলছে। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ ফ্লাট কোভিড সংক্রমণের আগেই গত দুই বছরের মধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। কোভিডের ধাক্কা সামলিয়ে এখন সব ফ্ল্যাটের বিক্রি প্রায় শেষের দিকে। সামনে নতুন প্রকল্পের কাজ শুরু হতে যাচ্ছে।

তবে কোভিড-১৯ মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে আবারও কিছুটা ধীরগতি লক্ষ করা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন নাভানা রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ (মার্কেটিং) এস এম মাসুদুর রহমান।

তিনি বলেন, “মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত ব্যবসা একেবারেই বন্ধ ছিল। জুলাই থেকে কিস্তির টাকা তোলা ও নতুন ফ্ল্যাট বিক্রি শুরু হয়েছে। তবে ফ্ল্যাটের অবস্থান ও আধুনিক সুবিধার ওপর ভিত্তি করে বিক্রির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটি দিকই রয়েছে।”

আবাসন খাতের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি রূপায়ন রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের ফ্ল্যাট বিক্রিও বেড়েছে সেপ্টেম্বর থেকে।

রূপায়ন হাউজিং লিমিটেডের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ওমর ফারুক  বলেন, বাজেটে বিনা প্রশ্নে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেয়ায় দেশের বাইরে টাকা পাঠানোর হার কমেছে। ফলে আবাসন খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে।” ফ্ল্যাট বিক্রি বৃদ্ধির পেছনে এটি বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে বলে তিনি মনে করেন।

ফ্ল্যাটের বিক্রি বেড়েছে বলে জানিয়েছে আবাসন খাতের অন্যান্য বড় প্রতিষ্ঠানগুলোও। নতুন ক্রেতারা এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করছেন।

তবে এখনো সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো।

ঢাকার মিরপুরের ড্রিম প্যালেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন  বলেন, “৯০ শতাংশ গ্রাহক মহামারির সময় কিস্তি পরিশোধ করেননি। এখন কিছু মানুষ কিস্তির টাকা দেয়া শুরু করেছেন। নতুন ফ্ল্যাটের বিষয়েও গ্রাহকরা আগ্রহ প্রকাশ করছেন। তবে ব্যবসা আগের অবস্থায় ফিরতে তাদের কমপক্ষে আরও এক বছর লাগবে।”

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম জানান, মূলত রিয়েল এস্টেট খাতেই বেশিরভাগ কালো টাকার বিনিয়োগ চলছে। এ খাতে বিনিয়োগের চেয়েও এ অর্থের পরিমাণ বেশি।

রিয়েল এস্টেট খাত ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রেও কালো টাকা ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হলে অর্থনীতির ইতিবাচক পরিবর্তন হতো বলে মনে করেন তিনি।

“এতো অল্প পরিমাণ বিনিয়োগে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া সুবিবেচিত নয়। অর্থনীতিতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের অন্যান্য পদ্ধতিও চিন্তা করতে হবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here