করোনায় যুক্তরাষ্ট্র নয়, এশিয়ায় অতি ধনীর উত্থান

করোনা মহামারির প্রকোপ থেকে অর্থনীতিকে রক্ষা করতে যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে দেশগুলো, তাতে লাভবান হয়েছেন বিশ্বের ধনীরা। স্বল্প সুদের হার ও অনুকূল রাজস্ব প্রণোদনার কারণে তাঁদের সম্পদের মূল্য বেড়েছে। এই পরিস্থিতির কারণে অতিধনী জনসংখ্যা গত ১২ মাসে বেড়েছে ২ দশমিক ৪ শতাংশ। অতিধনী বেড়ে হয়েছে ৫ লাখ ২০ হাজার। ২০২৫ সালের মধ্যে অতিধনীর সংখ্যা ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৬ দশমিক ১ লাখ হতে পারে। শুরুতে কেবল উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে এমনটা দেখা গেলেও এই ধনী সবচেয়ে বেশি বেড়েছে এশিয়ায়। এশিয়ায় বেড়েছে ১২ শতাংশ। দেশ হিসেবে অতিধনীর সর্বাধিক বৃদ্ধি দেখা গেছে, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, পোল্যান্ড ও সুইডেনে। তবে বিশ্বের সব অঞ্চলেই যে অতিধনীর সংখ্যা বেড়েছে, এমনটা নয়। লাতিন আমেরিকা, রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে বরং কমেছে। কারণ মহামারি স্থানীয় অর্থনীতিকে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, যা সামাল দিতে পারেননি ধনীরাও। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা সংস্থা নাইট ফ্রাংকের ‘দ্য ওয়েলথ রিপোর্ট-২০২১’ অনুযায়ী এসব তথ্য উঠে এসেছে।

সম্পদশালীর মূল গল্পটা এশিয়ার

বরাবরই অতিধনীর সংখ্যা বেশি যুক্তরাষ্ট্রে, বিশেষ করে নিউইয়র্কে। তবে আগামী পাঁচ বছর এশিয়ায় অতিধনীর সংখ্যা বাড়বে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে। বিশ্বে যেখানে এই প্রবৃদ্ধি থাকবে গড়ে ২৭ শতাংশ, এশিয়ায় হবে ৩৯ শতাংশ এবং ২০২৭ সাল নাগাদ অতিধনীর অংশ বেড়ে ২৪ শতাংশ হবে এশিয়ার। ধনী বাড়বে বেশি চীনে। অঞ্চলটি ইতিমধ্যে অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে বেশি বিলিয়নিয়ারের (বিশ্বের ৩৬ শতাংশ) আবাসস্থল। ২০২৫ সালের মধ্যে চীনের ধনী বাসিন্দা বাড়বে ২৪৬ শতাংশ। ধনী বৃদ্ধির দিক দিয়ে ভারতও এগিয়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনা মহামারির মধ্যেও ভারতে বেড়েছে শতকোটিপতির সংখ্যা। ২০১৯ সাল শেষে দেশটিতে শতকোটিপতির সংখ্যা ছিল ১০৪। ২০২০ সাল শেষে যা হয়েছে ১১৩ জন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সাল নাগাদ ভারতে শতকোটিপতির সংখ্যা ৪৩ শতাংশ বেড়ে ১৬২ জনে পৌঁছাবে।

ঝুঁকি বাড়াবে কোভিড-বৈষম্য, ভূরাজনীতি

কোভিড-১৯-কে আগামীর সম্পদ সৃষ্টির সবচেয়ে বড় একক ঝুঁকি হিসাবে দেখা হয়। বিশ্লেষকেরা বিশ্বাস করেন যে বেশির ভাগ দেশেই আয়-বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া বৈশ্বিক ভূরাজনীতির চাপ সর্বদা সম্পদ সৃষ্টিতে একটি বিশাল ভূমিকা পালন করে। বিশ্বে এখন রাজনৈতিক উত্তেজনা অনেকটাই শান্ত হয়ে আছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন দায়িত্ব নেওয়ার পর হোয়াইট হাউস আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শান্ত দৃষ্টিভঙ্গি আনবে বলেই আশা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া ২০২০ সালের শেষের দিকে যুক্তরাজ্য ও ইইউর মধ্যে একটি ব্রেক্সিট চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়; এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৫টি দেশকে নিয়ে ১৫ নভেম্বর গড়ে ওঠে বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্যিক জোট; ২০২০-এ ইইউ ও চীনের মধ্যে একটি নতুন বাণিজ্য চুক্তিও বৈশ্বিক শান্ত পরিস্থিতির নির্দেশক। এখানে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জোটটি নিয়ে একটু ভেঙে বলা যাক। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ান ও তাদের মুক্ত বাণিজ্য অংশীদার ৫টি দেশ গত নভেম্বরে এই জোট গঠনের চুক্তিতে সই করে, যা বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ চুক্তির মাধ্যমে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় বাণিজ্যে চীনের প্রভাব আরও জোরদার হবে।

তবে সব শঙ্কা এখনো কাটেনি। সহযোগিতার নানা পদক্ষেপ নেওয়া সত্ত্বেও উত্তেজনা রয়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়া ও চীনের মধ্যে বিবাদ, সেই সঙ্গে বাইডেন প্রশাসনের পক্ষে চীনের বিপক্ষে বর্তমান হার্ডলাইন থেকে দূরে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। সেই সঙ্গে জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলের বিদায় ইউরোপের রাজনীতিতে নেতৃত্বের পরিবর্তন আনবে। বলা যায়, দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ছে। পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে যদি বর্তমান ‘কে-আকৃতির’ উত্তরণ অব্যাহত থাকেও, সামাজিক সংকট বেড়ে যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here