উৎসে কর আহরণে কঠোর অবস্থানে এনবিআর

স্টাফ রিপোর্টার: সর্বশেষ অর্থবছরে আয়কর খাতে আহরিত মোট রাজস্বের ৬৭ শতাংশই এসেছে উৎস আয়কর থেকে। সাধারণত বছর শেষে রিটার্নের মাধ্যমে কর দেয়ার রীতি থাকলেও বাস্তবে সারা বছরই ব্যবসা, সেবা ও আয়ের উৎস থেকে টিডিএস (ট্যাক্স ডিডাকশন অ্যাট সোর্স) নামে এ কর কেটে নেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেটে নেয়া উৎস কর রাজস্ব বাড়ানোর সহজ পদ্ধতি হওয়ায় এর পরিধি বৃদ্ধি ও আহরণে কঠোর হচ্ছে সংস্থাটি।

এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, বছর শেষে এককালীন আদায়ের চেয়ে আয়ের উৎস পর্যায়ে কর কর্তনের পদ্ধতিটি বিশ্বব্যাপী প্রচলিত। বিশ্বের সব দেশেই করের বড় অংশই এভাবে আহরণ করা হয়। বাংলাদেশেও করদাতাদের আয় থেকে প্রতি মাসে ও বিভিন্ন সেবার বিপরীতে ৫ শতাংশ হারে এ কর কর্তন করে এনবিআর। পরে বছর শেষে এটি সমন্বয় করা হয়। বর্তমানে আয়করের ৬০-৬৫ শতাংশ এ খাত থেকে এলেও এনবিআরের লক্ষ্য— শুধু উৎস কর থেকেই মোট করের ৮০ শতাংশ আহরণ করা। এ কারণে উৎস করের পরিধি বাড়িয়ে মাঠ পর্যায়ে তা আদায়ে আরো সতর্ক হতে কর অঞ্চলগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এনবিআর চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া বলেন, আয়কর বাবদ আমাদের মোট আহরণের ৬০ শতাংশের বেশি উৎস কর থেকে আসে। উৎস করের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি সঠিকভাবে কর্তন করা হচ্ছে কিনা কিংবা কর্তন হলেও সময়মতো জমা দেয়া হচ্ছে কিনা এসব বিষয়ে মনিটরিং বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে কর কর্মকর্তারাও প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে উৎস কর ঠিকমতো আদায় করছেন কিনা, এ বিষয়টিও নজরে আনার উদ্যোগ নিয়েছি।

মাঠ পর্যায়ে পাঠানো চিঠিতে এনবিআর জানিয়েছে, ১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশ অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট খাতে উৎস কর কর্তন ও সংগ্রহ করার বিধান রয়েছে। এ কর আদায়ে করদাতাদের পাশাপাশি কর কর্তৃপক্ষকে সচেষ্ট হতে হবে। বিশেষ করে ঠিকাদার ও সরবরাহকারীদের বিল প্রদানের সময় এবং অন্যান্য সেবা প্রদানের সময়ই কর কেটে রাখতে হবে। কোনো করদাতা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি উৎস কর প্রদান না করে, তবে তাকে আইনের ৫৭ ধারা অনুযায়ী খেলাপি করদাতা হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। কর আহরণে নিয়োজিত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যদি উৎস কর আহরণে ব্যর্থ হন, তবে তাকে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করে তার কাছ থেকে সুদসহ কর আদায় করা হবে।

কর্মকর্তাদের উৎস কর আহরণে কঠোর হওয়ার নির্দেশনা দিয়ে এনবিআর বলছে, আয়কর বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাকে উৎস কর কর্তনসংক্রান্ত আইনগত বিধানগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। বিশেষভাবে আয়কর অধ্যাদেশের ৫৮(৩) ধারা ও আয়কর বিধিমালার ১৮(৭) অনুযায়ী নির্ধারিত ছকে উৎস কর কর্তনকারীকে প্রতি মাসে উৎস কর কর্তনের বিস্তারিত বিবরণী সংশ্লিষ্ট আয়কর কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

এনবিআর জানিয়েছে, বর্তমানে ৫৬টি খাত থেকে উৎস কর আদায় করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে— সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন, ঠিকাদারের বিল, সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংকের আমানতের সুদ আয়, জমি কেনাবেচা, সংবাদপত্র, রেডিও-টিভিতে প্রচারিত বিজ্ঞাপন, পেশাগত কারিগরি সেবাদানকারী অথবা কারিগরি সহায়তা ফি, ক্যাটারিং সার্ভিস, ক্লিনিং সার্ভিস, কালেকশন অ্যান্ড রিকভারি সার্ভিস, প্রাইভেট সিকিউরিটি সার্ভিস, ম্যানপাওয়ার সাপ্লাই সার্ভিস, ক্রিয়েটিভ মিডিয়া সার্ভিস, পাবলিক রিলেশন সার্ভিস।

ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সার্ভিস, ট্রেনিং-ওয়ার্কশপ ফি, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে কারিগরি সেবা প্রদানকারী বা সেবা সরবরাহকারী এজেন্টের ফি, ক্রেডিট রেটিং সেবা ফি, মোটর গ্যারেজ বা ওয়ার্কশপের ফি, বেসরকারি কনটেইনার পোর্ট বা ডকইয়ার্ড সেবার ফি, শিপিং এজেন্সি কমিশনের বিপরীতে নির্ধারিত হারে উৎস কর আদায় করা হয়। তবে এর পরিধি বাড়াতে আগামী বাজেট থেকে এ তালিকায় আরো পাঁচটি খাত যুক্ত করে মোট ৬১ খাত থেকে উৎস আয়কর কর্তনের প্রক্রিয়া চলছে জানিয়েছেন এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

পরিধি বাড়ানোর কারণে কয়েক বছর ধরেই আয়করে বাড়ছে উৎস করের অবদান। সর্বশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আয়কর থেকে এনবিআর রাজস্ব আহরণ করেছে ৬৫ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিভিন্ন খাতের উৎস থেকে কেটে নেয়া কর বাবদই এসেছে ৪৩ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা, যা মোট আয়করের ৬৭ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। গত অর্থবছরে করপোরেট করসহ অগ্রিম কর থেকে আরো ২০ শতাংশের মতো আহরণ হয়েছে। আর রিটার্নের ভিত্তিতে আহরণ হয়েছে ৭ শতাংশ। সূত্র বণিক বার্তা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here