অনিশ্চয়তায় ঝুলছে দেশের প্রকাশনা শিল্প

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস তার ভয়াবহ থাবা মেলার ঠিক আগ মুহূর্ত পর্যন্তও দেশের প্রকাশনা শিল্প ছিল তুঙ্গে। ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা শেষ হবার পরপরই মার্চের দিকে করোনাভাইরাসের কারণে আস্তে আস্তে স্থবির হয়ে পড়ে জনজীবন। সেইসঙ্গে এই এক বছরের মধ্যে মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্পে ঘটে গেছে এমনই এক অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়, যা পুরো একটি প্রজন্মের চাইতেও বেশি নিচে নামিয়ে দিয়েছে একে।

উদ্যোক্তাদের ভাষ্যমতে, ইতোমধ্যেই এই খাতে হয়ে যাওয়া ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা।

এর মধ্যে প্রিন্টিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের ( পিআইএবি) ক্ষতির পরিমাণ ৮ হাজার কোটি টাকা, বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির ক্ষতি হয়েছে ৭৫০০-৮০০০ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির ক্ষতি হয়েছে ২০০ কোটিরও বেশি।

খন্দকার প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং ব্যবসা করে আসছে ১৯৯৪ সাল থেকে। প্রতিষ্ঠানের মালিক ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে এবং নিজের আগের লাভকৃত অর্থ দিয়ে নতুন নতুন মেশিনারি জিনিসপত্র কিনেছেন এবং ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন।

কিন্তু এ বছর মহামারি শুরু হবার পর থেকেই মাতুয়াইলে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি মাসে ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়েছে অন্তত ৬ লাখ টাকা।  মালিক তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন নিজের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে। কিন্তু প্রতি মাসে আট লাখ টাকা ব্যাংক লোন পরিশোধ ও সেইসঙ্গে ছয় লাখ টাকা ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা তার জন্যে ক্রমশ অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

খন্দকার প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের মালিক রায়হান খন্দকার বলেন, ‘এটা আমার পারিবারিক ব্যবসা। আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম, একদিন আমার  এই প্রতিষ্ঠান দেশের সবচেয়ে বড় প্রিন্টিং প্রেস হবে। কিন্তু করোনা আমায় প্রায় বরবাদ করে দিয়েছে।’

খন্দকারের মতো আরও অনেক প্রিন্টিং হাউস মালিকই চরম অর্থসংকটে রয়েছেন। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে তাদের টিকে থাকা মুশকিল হবে বলে তারা জানান।

এমনকি এ বছর একুশে বইমেলা হবে কি না, তাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বাংলা একাডেমি এখনো বইমেলা শুরুর কোনো তারিখ জানাতে পারেনি।

এর মধ্যেই বই প্রকাশনার সময়কালও শেষ প্রায়। সাধারণত জানুয়ারির মধ্যেই বই ছাপার কাজ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু এই বছর  মাত্র ১০% কাজ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে পিআইএবি।

পিআইএবি’র সভাপতি শহীদ সেরনিয়াবাত’কে বলেন, ‘আমরা কোনোদিন ভাবিনি, এ রকম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হবে। ১৯৭১ সালের পর থেকে এই শিল্প খারাপ অবস্থায় ছিল, কিন্তু ২০১০ সাল থেকে এটি দেশের অন্যতম উদীয়মান শিল্পক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত হতে থাকে। কিন্তু এখন আমরা জানি না আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারব কি না।’

শহীদ সেরনিয়াবাত আরও বলেন, দেশে এই মুহূর্তে থাকা ৭৫০০ প্রিন্টিং প্রেস শুধু টিকে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট শ্যামল পাল  জানান, তার সংগঠনে প্রায় ২৬ হাজার সদস্য ও দেড় লাখ কর্মী রয়েছেন। এরা সবাই প্রতিদিন ২.৬০ কোটি টাকার লোকসান গুনছেন।

তিনি আরও বলেন, সরকার কোনো প্রণোদনা প্যাকেজ না দিলে তাদের পক্ষে এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।

পিআইএবি’র তথ্যমতে, মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্প চলে মূলত বই, গার্মেন্টসের আনুষঙ্গিক, ঔষধ এবং খাদ্য আনুষঙ্গিক উপকরণ ও অন্যান্য ব্যবসায়িক দ্রব্যাদি দিয়ে।

এর মধ্যে বইয়ের জন্য প্রিন্টিং প্রেস আছে ২ হাজার, গার্মেন্টস আনুষঙ্গিকের জন্য ২ হাজার, খাদ্য সার্ভিসের জন্য ৫০০ এবং বাকিগুলো নানা ছোট-বড় ব্যবসায়িক কাজে নিয়োজিত।

অনন্যা প্রকাশনীর কর্ণধার মনিরুল হক জানান, তার প্রতিষ্ঠান প্রতি মাসে দুই লাখ টাকা ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

প্রকাশনা খাতের জন্য নেই বরাদ্দ

করোনা দুর্যোগের শুরুর দিকে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশনা সমিতি সরকারের কাছে ১০০ কোটি টাকা ঋণ চেয়ে এখনো কোনো সাড়া পায়নি। প্রকাশনা খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে একটি প্রণোদনা প্যাকেজ চেয়েও তারা কোনো উত্তর পায়নি।

সংগঠনের সভাপতি শ্যামল পাল বলেন, এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রকাশনা হাউসগুলোর সরকারের সাহায্য খুবই দরকার।

অন্যদিকে, অনন্যা প্রকাশনীর মালিক মনিরুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের প্রকাশিত কোনো সৃজনশীল বই এখনো বিক্রি হয়নি। আমরা চাই সরকার আমাদের বইগুলো বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য কিনে নিক। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় চাইলে এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’

অনিশ্চয়তার মুখে একুশে বইমেলা

বাংলা একাডেমির হিসাব অনুযায়ী সব মিলিয়ে ৪,৯১৯টি নতুন বই ২০২০ একুশে বইমেলায় প্রকাশ পেয়েছিল। বিক্রি হয়েছিল মোট ৮২ কোটি টাকা।

২০১৬, ২০১৮ ও ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে বইমেলায় প্রকাশিত নতুন বইয়ের সংখ্যা ছিল বেশি। কিন্তু এ বছর বাংলা একাডেমি এখনো বইমেলা শুরুর ব্যাপারে তাদের সিদ্ধান্ত জানায়নি।

এই প্রসঙ্গে মনিরুল হক জানান, তারা ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৭ মার্চ পর্যন্ত বইমেলা রাখার ব্যাপারে বাংলা একাডেমির কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।

ফি জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল গত ৩১ ডিসেম্বর।

মনিরুল হক বলেন, ‘ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে বইমেলা শুরু করাও দুর্ভাগ্যজনক। এদিকে আবার মার্চে শুরু করাও কঠিন; কারণ তখন বৃষ্টি-বাদল থাকে। তাই আমাদের আরও বেশি লোকসান গুনতে হবে।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here