রেমিট্যান্সের উৎস দেশে পরিবর্তন আসছে

স্টাফ রিপোর্টার : দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস প্রবাসীদের পাঠানো আয় বা রেমিট্যান্স। বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয়ের প্রধান উৎস দেশ হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ওমান, বাহরাইন, মালয়েশিয়া ও পাশ্চাত্যের দেশ যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, লিবিয়া, বাহরাইন থেকে রেমিট্যান্স আসা কমতে শুরু করেছে।

অন্যদিকে কাতার ও ইউরোপের দেশ ইতালি, জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ। বাংলাদেশ ব্যাংক ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

রেমিট্যান্সবিষয়ক বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশের আমদানি বাণিজ্যের দায় পরিশোধে ২৭ শতাংশ অবদান রাখে রেমিট্যান্স। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ৬৭ শতাংশ গড়ে উঠেছে রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে। রেমিট্যান্সের কারণেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সক্ষমতা রয়েছে বাংলাদেশের। এছাড়া বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে রেমিট্যান্স।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, মোট রেমিট্যান্সে ৩০ শতাংশের বেশি অবদান সৌদি আরবের। তবে মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশ থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। তথ্য বলছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন ৩৩৪ কোটি ৫২ লাখ মার্কিন ডলার। এর পরের অর্থবছর থেকে তা কমতে শুরু করে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ২৯৫ কোটি ৫৫ লাখ ডলার।

এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স কমেছে ৩৮ কোটি ৯৬ লাখ মার্কিন ডলার। স্থানীয় মুদ্রায় যা তিন হাজার ৩১২ কোটি ২৮ লাখ টাকা। সর্বশেষ গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা নেমে দাঁড়ায় ২৫৯ কোটি ১৫ লাখ ডলার। তিন বছরের মাথায় রেমিট্যান্স কমেছে ছয় হাজার ৪০৬ কোটি টাকা। শুধু একটি দেশ থেকেই প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা কম এসেছে বাংলাদেশে।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জনশক্তি রফতানিবিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকেই সৌদি আরবে জনশক্তি রফতানি কমে আসছে। যদিও বর্তমানে বাংলাদেশের মোট শ্রমবাজারের ৩০ শতাংশের ওপরে রয়েছে দেশটিতে।

একইভাবে রেমিট্যান্স কমেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেও। দেশটিতে জনশক্তি রফতানিও কমে এসেছে। ২০১২ সালের পর থেকেই দেশটির শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের অবস্থান দুর্বল হয়ে আসছে। সর্বশেষ ২০১২ সালে দেশটিতে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি গিয়েছিল দুই লাখ ১৫ হাজার ৪৫২ জন। কমতে কমতে গত বছরে দেশটিতে গিয়েছে মাত্র এক হাজার ২৭১ জন।

জনশক্তি যাওয়া কমে আসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে রেমিট্যান্সের ওপর। দেশটি থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৮২ কোটি ৩৭ লাখ ডলার। সর্বশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশটি থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ২৪২ কোটি ৯৯ লাখ ডলারের। এই তিন বছরে দেশটি থেকে রেমিট্যান্স কমেছে ৩৯ কোটি ৩৮ লাখ ডলার, স্থানীয় মুদ্রায় যা তিন হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা।

একইভাবে রেমিট্যান্স কমেছে লিবিয়া, বাহরাইন, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে। শুধু পাশ্চাত্য নয়, পশ্চিমা দেশ বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকেও কমছে রেমিট্যান্স। তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৩৮ কোটি ডলার। তা কমে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে হয়েছে ১৯৯ কোটি ডলার। এ দেশ থেকে গত তিন বছরে অর্থ আসা কমেছে তিন হাজার ২৫২ কোটি ৯৫ লাখ টাকার। বাংলাদেশে রেমিট্যান্স আসা দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ছিল তৃৃতীয়। সেই দেশ থেকেও গত চার বছরে রেমিট্যান্স আসা কমেছে সাড়ে ১৫ শতাংশের বেশি।

অবশ্য এর বাইরে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পেয়েছে কাতার, কুয়েত, ওমান, ইউরোপের দেশ ইতালি, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, জাপান থেকে। এদের মধ্যে রেমিট্যান্স প্রবাহে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে কাতার, ইউরোপের দেশ ইতালি ও দক্ষিণ কোরিয়ার।

২০১৪-১৫ অর্থবছরে কাতার থেকে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩১ কোটি ডলার। গত অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৮৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার। তিন অর্থবছরে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পেয়েছে আড়াই গুণের বেশি। অন্যদিকে এই সময়ে ইউরোপের দেশ ইতালি থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ ২৬ কোটি থেকে ৬২ কোটি ২২ লাখ ডলারে উন্নীত হয়েছে। এই সময়ে জার্মানি থেকে রেমিট্যান্সের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে দ্বিগুণ।

তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স এসেছে এক হাজার ৫৩১ কোটি ৬৯ লাখ ডলার, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এক হাজার ৪৯৩ কোটি ১১ লাখ ডলার, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এক হাজার ২৭৬ কোটি ৯৪ লাখ ডলার, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কিছুটা বেড়ে হয়েছে এক হাজার ৪৯৮ কোটি ডলার।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে রেমিট্যান্স। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণে আমাদের আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। এতে বৃদ্ধি পাবে পণ্য আমদানি ব্যয়। পাশাপাশি প্রবাসীরা দেশের কর্মসংস্থানে বড় ভূমিকা রাখে। এজন্য রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো প্রয়োজন। নতুন শ্রমবাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি পুরনো শ্রমবাজারও ধরে রাখতে হবে। এজন্য প্রয়োজন শ্রমবাজারবান্ধব কূটনৈতিক প্রচেষ্টা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here