মুনাফার সাথে ঝুঁকিও মাথায় রাখতে হবে

স্টাফ রিপোর্টার:  শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করা সব শ্রেণীর বিনিয়োগকারীর প্রধান লক্ষ্য মুনাফা করা। সল্প, মধ্যম বা দীর্ঘ, যে মেয়াদেই বিনিয়োগ করুন না কেন মুনাফা চাই। কিন্তু এ কথাও সত্য সকল বিনিয়োগ ক্ষেত্র গুলোর মধ্যে পুঁজিবাজার ঝুঁকি দিক দিয়ে প্রথম সারিতে। আমাদের দেশের অনেক বিনিয়োগকারী বিনিয়োগের সময় বিষয়টি বিবেচনায় নেন না বা ভুলে যান অথবা জানেনই না।

পুঁজির নিরাপত্তার বিষয়টি আগে, তারপর লাভ। দীর্ঘ মেয়াদে পুঁজির নিরাপত্তা ভাল মৌলভিত্তির কোম্পানিই দিতে পারে। সল্পমেয়াদে নানা কারসাজি করে কৃত্রিম ডিমান্ড সাপলাই সৃষ্টি করে শেয়ারের দাম বাড়ানো কমানো গেলেও, দীর্ঘ মেয়াদে ঐ দাম ধরে রাখা যায় না।

শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ করার পূর্বে আপনি নুন্যতম কতটুকু মুনাফায় সন্তুষ্ট হবেন, তা আগেই নির্ধারণ করে নেয়া উচিত। মুনাফা আর ঝুঁকি পরস্পরের সমানুপাতিক। যে বিনিয়োগে ঝুঁকির মাত্রা কম সেখানে মুনাফার হার কম। যেমন- ব্যাংকে এফডিয়ার  বন্ড।

শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ ঝুকিপূর্ণ। তাই এখান থেকে আপনি ব্যাংক রেটের চাইতে বেশি মুনাফা প্রত্যাশা করবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বেশি পরিমাণ ঠিক করতে গিয়েই আমরা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা অনেকেই ভুলটি করি। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে আমরা অস্বাভাবিক লাভ চাই খুব কম সময়ে। যেমন ব্যাংকে এফডিয়ার করে যেখানে ১০% নিয়ে সন্তুষ্ট । সেখানে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে ২০% বা ২৫% নিয়েও মনভরে না।

সহনীয় মাত্রার চাইতে বেশি ঝুঁকি নেয়ার ফলেই আমরা ক্ষুদ্রপুঁজি হারিয়ে ফেলি। আবাব ভুল বিনিয়োগ হলে স্টপ লসও নেই না। ৫০% মুনাফা করার আশায় বিনিয়োগ করার আগে ভাবুন ৫০% লস মেনে নেবার মত আর্থিক সামর্থ আপনার আছে কি-না। ১৫% লস করার সামর্থ নিয়ে ৫০% বা ১০০% মুনাফা টার্গেট করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ততটুকু লাভেই সন্তুষ্ট থাকুন, যতটুকু লস আপনি মেনে নিতে পারবেন।

অনেকে বলবেন মার্কেটেতো এক মাসে ১০০%  লাভ হয় আমারা দেখি। হ্যাঁ সত্য, তবে সেটা অন্য খেলা! সেখানে ক্ষুদ্র-বিনিয়োগকারীর জন্য নয়। সেখানে গ্যাম্বেলিং হয়। গ্যাম্বেলারদের প্রচুর টাকা, ক্ষমতা, প্রভাব, মার্কেট বিশ্লেষণের ক্ষমতা আছে অথবা স্পেশাল ফান্ডামেন্টাল, টেকনিক্যাল , মেন্টাল বিশ্লষণে দক্ষ এমন ব্যক্তি বা গোষ্ঠির সার্ভিস নেয় (টাকার বিনিময়ে সেবা)।

কৃত্রিম কৃত্রিম ডিমান্ড সাপলাই সৃষ্টি  করা হয়।  অনেক সময় নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন কোডে (বিওতে) বাই সেল করে দাম বাড়ান হয়। দক্ষ ও অভিঙ্গ না হলে এসব শেয়ার কিনলে আপনি ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারেী থেকে আরও ক্ষুদ্র হবেন। ছোট বিনিয়োগকারী হিসেবে আমাদের উচিত নিজ সঞ্চয়ের একটি অংশ শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ করা। কোনভাবেই ব্যাক্তিগত ঋণ বা মার্চেন্ট ব্যংক থেকে মার্জিন ঋণ নিয়ে ক্ষুদ্র বিনিয়গকারীদের শেয়ার মার্কেটে আসা উচিত নয়।

কারন ১৫-১৮% সুদে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করলে আপনাকে ২০-৩০% মুনাফা করতে হবে। আর ২০-৩০% মুনাফা ২/৩ টি ট্রেড থেকে করা সম্ভব হলেও সারা বছর ব্যাপী এই হার ঠিক রাখা প্রায় অসম্ভব। যদি আপনি শেয়ার বাজারে অনভিজ্ঞ হোন বা বাজার পরিস্থিতি (ডাইনট্রেন্ডে) প্রতিকূল অবস্থায় থাকে তবে আরও কঠিন।যদি এটা এতোই সহজ হতো তবে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো মার্জিন রোন না দিয়ে নিজেরাই ব্যবসা করতো। নিজেরা পারছে না বলেই আপনার কাছে লোন বিক্রি করে ডবল লাভ করছে। একদিকে ঋণের সুদ নিচ্ছে অন্যদিকে শেয়ার ক্রয় বিক্রয়ের কমিশন ব্যবসা করছে।

শেয়ার মার্কেট এমন একটি জায়গা যেখানে আপনার কিছু ভুল পদক্ষেপ ১০০% পুঁজি হারানোর জন্য যথেষ্ট। ভুল করলেই আর্থিক দন্ড। দু:খিত বলে মাপ পাওয়ার সুযোগ নাই। তাই আপনার সব সঞ্চয় শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ না করে ২/৩ টি ভিন্ন মাধ্যমে বিনিয়োগ করুন। যেমন- ব্যাংক ডিপোজিট, বন্ড, স্থাবর সম্পত্তি ও শেয়ার বাজার।

শেয়ার মার্কেটে একটি স্টক থেকে আপনি দুভাবে মুনাফা করতে পারেন। কোম্পানির দেয়া বাৎসরিক লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড থেকে এবং ক্যাপিটাল গেইন (কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রির মাধ্যমে)। স্বাভাবিক অবস্থায় একটি স্টকের দাম তখনই বাড়ে যখন ঐ কম্পানির ভাল ব্যবসা থেকে অধিক মুনাফা করে এবং তা থেকে  নিকট ভবিষ্যতে ভাল ডিভিডেন্ড পাবার আশা- প্রত্যাশা থেকেই স্টকের দাম বাড়ে (ক্যাপিটাল গেইন)। যা থেকে আপনি লাভবান হতে পারেন। বিনিয়োগের জন্য স্টক বাছাই প্রকৃয়ায় সর্ব প্রথম কোম্পানির ভাল ব্যাবসা করার সামর্থ তথা ভাল ডিভিডেন্ড দেয়ার সামর্থ বিবেচনা করা উচিত।

আমাদের মার্কেটে একটা সময় ছিল যখন সবাই স্টক ডিভিডেন্ড পেতে খুব পছন্দ করত। অবশ্য এখন অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। সাধারন বিনিয়োগকারীগন এখন স্টক ডিভিডেন্ডের চাইতে ক্যাশ ডিভিডেন্ড পেতেই বেশি উৎসাহী।কারণ দেরিতে হলেও তারা বুঝতে পেরেছে ক্যাশ ডিভিডেন্ড ভাল। স্টক ডিভিডেন্ড মানে কোম্পানি আপনাকে মুনাফার টাকা না দিয়ে তা আবার তার নিজ ব্যবসায় বিনিয়োগ করবে এবং আপনাকে ঐ ব্যবসার আরও কিছুটা মালিকানা দেবে।

এখন ঐ ব্যবসা যদি সামনের দিন গুলোতে কম মুনাফা করে, তবে কম্পানির শেয়ার দর কমে যাবে এবং আপনি যে অতিরিক্ত স্টকগুল ডিভিডেন্ড হিসেবে পেলেন তার মূল্য কমে যাবে। ফলে ক্যাশের চাইতে স্টক ডিভিডেন্ড নেয়ায় আসলে আপনি ক্ষতিগ্রস্থ হলেন। তবে ভাল কোম্পানির ক্ষেত্রে স্টক ডিভিডেন্ডও ভাল। যে কোম্পানি মূলধন বাড়ার সাথে সাথে ব্যবসাও বাড়াতে সক্ষম এমন কোম্পানির স্টক ডিভিডেন্ড।

আবার অনেকে আছেন যারা কম মূল্যের ব্যাংক, মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করেন না। কারন এগুল শুধু ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেয়। ডিভিডেন্ড মৌসুমে দাম খুব একটা বাড়ে না তাই ভাল ক্যাপিটাল গেইন এখান থেকে সম্ভব না। কিন্তু দেখবেন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী তারা কিন্তু এগুলোতে বেশ বিনিয়োগ করে। কারণ তারা আসল বিশ্লেষণ বুঝতে সক্ষম এবং অতি মুনাফার লোভে পুঁজি হারাতে চায় না।

আচ্ছা ৫ টাকা মূল্যের স্টক/ইউনিট থেকে যদি আপনি ১ টাকা ক্যাশ ডিভিডেন্ড পান তবে আপনার মুনাফা কত হবে একটু হিসেব করুন, ২০% হ্যাঁ আপনি ঠিক দেখছেন, ৫ টাকায় ১ টাকা পেলে লাভ দড়ায় ২০%। ডিভিডেন্ডের পর হয়ত শেয়ারটির মূল্য এডজাস্ট হয়ে ৩.৫-৪ টাকায় চলে আসবে। কিন্তু যেহেতু ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছে সেহেতু মোট শেয়ার সংখ্যা একই থেকবে।

ফলে আগামী বছর কোম্পানির মুনাফা না বড়লেও এটি একই পরিমাণ ডিভিডেন্ড দিতে পারবে এবং দাম অল্প দিনেই আবার ৫ টাকায় চলে আসবে। তাই যারা প্রতিনিয়ত লস করেন তারা নিশ্চিন্তে এই রকম ২০% লাভ দেয়া কোম্পানি গুলোকে টার্গেট করতে পাড়েন। আমাদের মার্কেটে এমন হাজার হাজার বিনিয়োগকারী আছেন যারা সারা বছরে ১০০-১৫০ টি ট্রেড করেও বাৎসরিক ২০% মুনাফা করতে পাড়েন না।

ডে-ট্রেডিং করে (ব্রোকার হাউজগুলোকে কমিশন দিয়ে) বছর শেষে কত পারছেন্ট লাভ করতে পেরেছেন? হিসেব করে দেখুন। ডে-ট্রেডিং করে করে মানুষিক অশান্তি, আর (অপারচুনিটি কস্টের কথা) অন্য কাজে সময় দিলে যে লাভ হতো সেটা হিসেব করেছেন? আপনি বিনিয়োগকারী হলে আপনি আপনার পেশায় থেকে শেয়ার বাজারে ভাল কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে লাভবান হতে পারেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here