মুদ্রানীতি ও পুঁজিবাজারে তার প্রভাব

স্টাফ রিপোর্টার: প্রতি বছর দুইবার জানুয়ারি ও বছরের মাঝামাঝি সাধারণত জুলাইয়ে (প্রতিবার ছয় মাসের জন্য) মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরবর্তী ছয় মাসে বাজারে অর্থের প্রবাহ কেমন থাকবে (তারল্য পছন্দসই স্তরে রাখা উদ্দেশ্য), তার একটি প্রাক্কলন থাকে এতে। তাই এটি নিয়ে ব্যবসায়ী (মুদ্রানীতির মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা টাকার প্রবাহ সম্পর্কে জানতে চায়), বড় পুঁজির উদ্যোগতা, বিনিয়োগকারী (পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীসহ) সচেতন নাগরিকের নানা ধরনের প্রত্যাশা থাকে। একটি মুদ্রানীতি ঘোষণার সময়ে আগের প্রান্তিকে মুদ্রানীতির টার্গেটগুলো কতটুকু অর্জন হলো, তা পর্যালোচনা করা হয়।

মুদ্রানীতির মূলত লক্ষ্য দুটি। এক. মূল্যস্ফীতি (টাকার সরবারাহ বৃদ্ধি বা পন্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধি) সহনীয় পর্যায়ে রেখে মুদ্রার সরবারাহ নিয়ন্ত্রণ এবং জিডিপির প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে সহায়তা করা। এছাড়া কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, দারিদ্র বিমোচন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর মত সামষ্টিক লক্ষ্যমাত্রাসমূহ বিবেচনায় রাখা হয়।

তবে, মুদ্রানীতির আরেকটা কাজ হলো দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা  এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ঋণের প্রক্ষেপণের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি খাতে কতটুকু ঋণ বিতরণ করা হবে তা মুদ্রানীতির মাধ্যমে নির্ধারণ করা। বাংলাদেশ ব্যাংক বৈশ্বিক, অভ্যন্তরীণ এবং সামষ্টিক অর্থনীতিকে বিবেচনায় রেখেই মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে।  বাজারে অতিরিক্ত মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে গেলে মুদ্রাস্ফীতি হয়। এতে মুদ্রার মান কমে যায় এবং মুদ্রা দুর্বল হয়ে পড়ে।  তবে সব সময় মুদ্রানীতি ঠিকমতো কাজ করে এমনটি নয়, অনেক সময় হিতে বিপরীতও হয়।

পুঁজিবাজারে মুদ্রানীতির প্রভাব: সাধারণত মুদ্রানীতি ঘোষণার আগে নানা বিষয় নিয়ে বাজারে নানা ধরনের গুজব ছড়ানো হয়। যদিও মুদ্রানীতির সঙ্গে পুঁজিবাজারের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই, তবে কোনো কোনো সিদ্ধান্ত বাজারে (পরোক্ষ) প্রভাব ফেলে। এই আতঙ্কে প্রতিবছর মুদ্রানীতি ঘোষণার আগে বাজার অস্থিতীশীল (ইনডেক্স ও লেনদেনে) হয়ে পড়ে। আর এটা দেখে অনেকেই শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বেরিয়ে যান। ফলে শেয়ারের দরপতন হয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরবর্তীতে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র অর্থাৎ যারাই মুদ্রানীতিও ভয়ে শেয়ার ছেড়ে দেন পরবর্তীতে তারা আর তা ওই দরে সংগ্রহ করতে পারেন না অথবা মুদ্রানীতি ঘোষণার আগে শেয়ারে বাম বাড়তে দেখে, বাড়তি দামে শেয়ার কিনে লসে পাড়েন অনেক বিনিয়োগকারী। তাহলে মূল বিষয়টি কী?

মুদ্রানীতির মাধ্যমে মুদ্রা বাজার থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক যদি তার হাতিয়ারগুলো ব্যবহার করে তরল্য শুষে নেয় (টাকা উঠিয়ে নেয়)। তবে বাজার ধাক্কা অনুভব করে; তারল্য কমতে থাকে। শেয়ার বাজারে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ইনিস্টিটিউশনগুলোর হাতে নগত টাকার কমে যায়। ফলে তারা অনেক ক্ষেত্রে শেয়ার বিক্রি করে নগত টাকার জন্য। অন্যদিকে নতুন করে শেয়ার বাইয়ের  অগ্রহ কম দেখায়। নগত টাকার অভাব থাকার কারণে।

আর এ কাজগুলো তারা সাধারণত একত্রে করে। কারণ তাদের সকলের নগত টাকা সংকট থাকে। তাছাড়া ইনিস্টিটিউশনগুলোর কর্মী-কর্মকতারা উচ্চ শিক্ষিত ও দক্ষ, যারা একে অপারের সাথে অফিসিয়ালি বা নন-অফিসিয়ারি যোগাযোগে সার্বিক পরিস্থিতি দ্রুত বুঝে সেভাবে কাজ করতে পারে। কিন্তু ক্ষুদ্রবিনিয়োকারীরা বুঝতে সময় লাগে অথবা আদেও বুঝে না। ফলে তাদের লসের পাল্ল ভারি হয়।

অাবার  মুদ্রানীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক যদি মুদ্রা বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়ানো ব্যবস্থা করে তবে শেয়ার বাজারে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। যেটাকে শেয়ার বাজারে বিনিয়োকারীরা পুঁজিবাজার বন্ধব বলে।

মুদ্রানীতিকে কেন্দ্র করে বাজারে চলে নানা গুজোব-হুযোগ। তবে মূল বিষয় হলো মার্কেট (ইনডেক্স) যদি হাইতে (সাম্প্রতিক সময়ের উচ্চ মূল্যে) থাকে তবে মুদ্রানীতিকে কারণ দেখিয়ে নানা নেতিবাচক গুজোব ছড়িয়ে এক শ্রেণির চক্র মার্কেট কিছুটা ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। কারণ তাদের কম দামে শেয়ার কিনতে হবে।

আবার মার্কেট (ইনডেক্স) যদি লো থাকে (সাম্প্রতিক সময়ের নিন্মে) থাকে তবে নানা ইতিবাচক গুজোব ছড়িয়ে এক শ্রেণির চক্র মার্কেট আপে নেওয়ার চেস্ট করে। কারণ ইতোপূবে কম-দামে কেনা শেয়ার বেশি দামে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের হাতে দিতে হবে। আরোও অবাক করা বিষয় হলো সব অধিকাংশ সময় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা সাম্প্রতিক সময়ের গড় দামের বেশি দামে শেয়ার কেনে। যেখানে চতুর বড় বিনিয়োগকারীরা (লো-প্রাউজে) সাধারণত এক বছরের সময়ের কম মূল্যে শেয়ার কেনে।

বিগত বিভিন্ন সময়ে আমরা দেখেছি সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে শেয়ার বাজারে ইনডেক্স পড়তে। আর সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি প্রভাবে বাজারে তরল্য থাকলে শেয়ার বাজারে ইনডেক্স বাড়তে।

মূল্যস্ফীতি: সাধারণভাবে টাকার সরবারাহ বৃদ্ধি বা পন্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়াকে মূল্যস্ফীতি বলে। মানুষের হাতে বেশি টাকা এলে একটু স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে চায়। বেড়ে যায় মানুষের প্রত্যাশা। আর এ প্রত্যাশা থেকে ভোগবিলাসের দিকে ধাবিত হয়। পাল্টে যায় মানুষের জীবনমান। ভোগবিলাসের পেছনে ব্যয় হয় অতিরিক্ত অর্থ। এতে কোনো একক পণ্য কিনতে বেড়ে যায় প্রতিযোগিতা। ১০ টাকার পণ্য বিক্রি হয় ২০ টাকা।  এভাবে কোনো একক পণ্যের মূল্য দ্বিগুণ থেকে ক্ষেত্র বিশেষ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। টাকার ক্রয় ক্ষমতা কমে যায়। একেই বলে মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেলে সাধারণের দুর্ভোগ বেড়ে যায়। দুর্ভোগ বেড়ে যায় নির্ধারিত আয়ের মানুষের।

খাদ্য ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কারণে এশিয়ার অধিকাংশ অঞ্চলে মূল্যস্ফীতির মাত্রা বেশি। এছাড়াও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির কারণের মধ্যে  আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ ঋণ বৃদ্ধি প্রভৃতি কারণ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে খোলাবাজার কার্যক্রম, সংবিধিবদ্ধ জমার অনুপাত পরিবর্তন এবং ব্যাংক হার পরিবর্তনের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। মূল্যস্ফীতি  মুদ্রায় (টাকার) সরবরাহ কমানো , খাদ্য, জ্বালানি, বৈশ্বিক পণ্যমূল্য , ফসলে ভালো ফলন ইত্যাদি বিষয়ের ভূমিকা বেশি।

মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার: বাংলাদেশ ব্যাংক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে খোলাবাজার কার্যক্রম, সংবিধিবদ্ধ জমার অনুপাত পরিবর্তনসহ ব্যাংক হার পরিবর্তনের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত রেপো ও রিভার্স রেপো রেটের মাধ্যমে মার্কেটে সুদের হার কেমন হওয়া উচিত, তার একটি সংকেতও পাঠিয়ে থাকে। আমাদের দেশের পেক্ষাপটে মুদ্রানীতির অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ সীমাবদ্ধতার মূলে রয়েছে আমাদের রাজস্ব নীতির সঙ্গে মুদ্রানীতির কোনো সমন্বয়হীনতা

সাধারণ মানুষের লাভ ক্ষতি: মুদ্রানীতি সাধারণ মানুষের কী উপকারে আসে?  সাধারণ ভোগ্যপণ্যের দামস্তর বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের ঊর্ধ্বগতিকে গুরুত্ব দিয়ে মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হয়। মুদ্রানীতির ‘টুল’ বা যন্ত্র দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রা সরবরাহ (মানি সাপ্লাই) নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে আগামী দিনগুলোতে জিনিসপত্রের দাম কম থাকবে, নাকি বাড়বে।, দেশে বেকারের সংখ্যা বাড়বে, নাকি চাকরির সুযোগ তথা কর্মসংস্থান বাড়বে , দেশে দারিদ্র্য বিমোচনের গতি বাড়বে নাকি কমবে তার একটা রূপরেখা থাকে মুদ্রানীতিতে। প্রবৃদ্ধি বাড়লে সাধারণ মানুষের আয় রোজগার বাড়বে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি যদি বেশি হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ব্যয় বেড়ে যাবে।

বিনিয়োগ বৃদ্ধি: শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে কাজ হয় না। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ  গ্যাস ও অবকাঠামোগত সুবিধা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জণগণের ক্রয় ক্ষমতা, আমদানি রপ্তানী নীতি অনুকূলে পর্যাপ্ত জমির অভাব ও সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে বিনিয়োগ বাড়বে না। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদন  ডুয়িং বিজনেসে বাংলাদেশের প্রত্যাশিত অগ্রগতি নাই। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের মধ্যে ঘনিষ্ঠ আলোচনা ও সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

বেসরকারী ঋণ: প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও প্রবৃদ্ধি চাহিদার মধ্যে ন্যায়বিচার করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম কাজ তবে,  কাজটি কঠিন, বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি হলেও সেটা  অ-উৎপাদনশীল খাতে গেলে প্রবৃদ্ধিতে কাজে লাগে না ।  মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রতি অতিরিক্ত দৃষ্টি অথবা মাঝে মধ্যে জোর করে মূল্যস্ফীতি কমানো বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করে না কিংবা জাতীয় সম্পদ সৃষ্টি করে না।  বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি উৎপাদনশীল খাতে যাওয়াটা নিশ্চিত করতে হবে।

মুদ্রানীতি প্রকৃতি: প্রকৃতির দিক থেকে মুদ্রানীতি সাধারণভাবে দুই প্রকার। সম্প্রসারণমূলক অথবা সংকোচনমূলক। যখন মোট অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি পায়, তখন এটি সম্প্রসারণমূলক। আর সংকোচনমূলক যখন বাড়তি অর্থ সরবরাহ কমবে, সাধারণভাবে সম্প্রসারণমূলক নীতি এমন পরিস্থিতিতে নেয়া হয়, যেখানে সুদহার কমানোর মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দেয়া হয়। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার জন্য সংকোচনমূলক নীতি গ্রহণ করা হয়। সংকোচনমূক মুদ্রানীতির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে টাকার প্রবাহ কমিয়ে দেয়।

কিন্তু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ধারণা আমাদের অর্থনীতির সম্পূর্ণ স্ববিরোধী। আর টাকার প্রবাহ কমে গেলে, বাজারে তারল্য সংকট বেড়ে যায়। এ তারল্য সংকটের কারণে ঋণের সুদের হার বেড়ে যায়। আর ঋণের সুদের হার বেড়ে গেলে শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়লে মূল্যস্ফীতিতে সরাসরি প্রভাব পরার পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। আবার বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিলেও সরকারের বিশাল ঘাটতি বাজেটের অর্থায়নে ব্যাংক থেকে অতিমাত্রায় ঋণ নেয়া ঠেকাতে পারে না। এর ফলে একদিকে মুদ্রা সরবরাহ কমানো হলেও সরকার ব্যাংক থেকে অতিমাত্রায় ঋণ নিয়ে মুদ্রা সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়।

সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতিতে টাকার প্রবাহ বেড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বিনিয়োগ পরিবেশ না থাকলে শিল্পায়ন হয় না। প্রথমত রাজস্ব নীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয়হীনতা থাকে। দ্বিতীয়ত মুদ্রানীতির মাধ্যমে মুদ্রাসরবরাহ কমিয়ে বা বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। কেননা, সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে মূল্যস্ফীতির গতিপ্রবাহ। আমাদের মূল্যস্ফীতির প্রধান উপাদান হল খাদ্য মূল্যস্ফীতি (পণ্যের দাম বৃদ্ধি)।

এখন খাদ্যশস্য উৎপাদন কম হলে টাকার প্রবাহ কমিয়ে বা বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, মুদ্রানীতি খুব একটা কাজে আসে না। আবার বাজারে পণ্যের সরবরাহ ঘাটতি হলে অথবা মাফিয়া সিন্ডিকেট দ্বারা পণ্য মজুদ করা হলে পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এ ক্ষেত্রে মুদ্রানীতির তেমন কোনো কার্যকর নেই। তবে টাকার প্রবাহ কমিয়ে বিলাসজাত পণ্য কেনাকাটায় কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়, যা মূল্যস্ফীতি খুব একটা প্রভাব পড়ে না। পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ভারসাম্যমূলক মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে।

ব্যাপক মুদ্রার: মুদ্রানীতির অন্যতম লক্ষই হলো ব্যাপক মুদ্রা (এম. ২) অর্থাৎ ব্যাংকের সকল চলতি এবং সঞ্চয়ী আমানতের সমষ্টির নিয়ন্ত্রণ। ‘এম ২‘ প্রবৃদ্ধি নির্ভর করে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, সহনীয় মাত্রায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং একটি গ্রহণযোগ্য মাত্রায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বাস্তবমুখী প্রাক্কলনের ওপর। মুদ্রানীতি ঘোষণায় রিজার্ভ মুদ্রা এবং ব্যাপক মুদ্রার (এম. ২) প্রবৃদ্ধির হার বিবেচনায় থাকে। উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনে বিনিয়োগের উচ্চ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যার জন্য ব্যাপক মুদ্রা (এম২) সরবরাহ বাড়াতে হয়। এতে ব্যক্তিখাতের ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি পায়, যা বিনিয়োগকে ত্বরান্বিত করে।

 সিআরআর, রেপো, রিভার্স রেপোর :  সিআরআর (ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও) বৃদ্ধিতে করলে বুঝা যায় বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্বৃত্ত বাজার থেকে শুষে নিতে চাইছে। অন্যদিকে কমান মানে বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রবাজারে মুদ্রার সরবারাহ বাড়াতে চাইছে। রেপো ও রিভার্স রেপো মুদ্রানীতির অন্যতম হাতিয়ার।

অতিরিক্ত তারল্য তুলে নেয়ার জন্য কিছু পদক্ষেপ নেয় ব্যাংলাদেশ ব্যাংক । যেমন— ভোক্তাঋণের শর্ত আরো সহজ করা, যাতে এ খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি পায়। রেপো ও রিভার্স রেপো— উভয় রেটই আরো কমিয়ে আনা।কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত রেপো ও রিভার্স রেপো রেটের মাধ্যমে মার্কেটে সুদের হার কেমন হওয়া উচিত, তার একটি সংকেত পাঠিয়ে থাকে। এ দুটি রেটের হারের কোনো পরিবর্তন না করলে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই ব্যাংকের সুদের হার বা স্প্রেডের হারের কোনো পরিবর্তন চাইছে না বলে মার্কেটকে সংকেত যায়।

বাংলাদেশে মুদ্রানীতি  সুদের হার ও বিনিময় হারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা চেস্টা থাকে। সরকারি ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ও ক্লাসিফাইড বা শ্রেণীবদ্ধ ঋণের ওপর সার্বিক দুর্বল নজরদারি, বিশেষ করে শ্রেণীকৃত ঋণের বিপরীতে রিজার্ভ ছাড়, ব্যাংকিং খাতের সার্বিক তারল্যের ওপর প্রভাব পড়ে।

মুদ্রানীতি ভাল কাজ না করার কারণ: মুদ্রানীতির পাশাপাশি সরকারের রাজস্বনীতি (ফিসক্যাল পলিসি) ও বাণিজ্যনীতি (ট্রেড-ইমপোর্ট ও এক্সপোর্ট পলিসি) একই উদ্দেশ্যে কাজ না করলে বিশেষ করে ঋণের টাকার সদ্ব্যবহার না হলে ফল লাভ করা যায় না। আমাদের দেশে মুদ্রানীতির সঙ্গে রাজস্ব নীতির কোনো সমন্বয় নেই। সরকার বড় ব্যয়ের ঘাটতি বাজেট দেয়া হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে কোনো কাজে আসে না। বরং সাংঘর্ষিক হয়। টাকার প্রবাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু সরকারের বড় ব্যয়ের বাজেট দেয়ায় মুদ্রাসরবরাহ ঠিকই বেড়ে যায়।

আবার সরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধির যে টার্গেট ধরা হয়েছে  তা কতটুকু অর্জন হবে, সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। এর বড় কারণ হচ্ছে, সরকার সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ব্যাংকের সুদের হার থেকে অনেক বেশি।  ফলে জনগন সঞ্চয়পত্র কিনছে। মুদ্রানীতির কার্যকারিতা আছে উন্নত দেশগুলোতে। কিন্তু আমাদের এখানে তেমন কোনো কার্যকারিতা কম। দেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধির অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে গ্রামীণ অর্থনীতি। কিন্তু গ্রামীণ অর্থনীতিরে সঙ্গে মুদ্রানীতির তেমন কোনো সম্পর্ক নেই বললেই চলে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here