বীমা কোম্পানির হিসেব-নিকেশ

ইমরান হোসেন : সাধারণ চোখে বীমা ব্যবসার, বিশেষ করে জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর ব্যবসা (প্রফিটিবিলিটি) বোঝাই ফান্ডামেন্টাল এ্যানালাইসিসের (মৌলভিত্তি বিশ্লেষণের) জটিল কাজ। তীব্র প্রতিযোগিতা ও কমিশন বানিজ্য অামাদের  দেশের বীমা খাতকে বাড়তি ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। এ কারণে  বীমা খাতের শেয়ারে বিনিয়োগ সাধারণের জন্য তুলনামূলক বেশি  ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ কিছু প্রিমিয়ামের বিনিময়ে অন্যের ঝুঁকি নিজের কাঁধে নেয়াই তাদের মূল ব্যবসা।

এ ঝুঁকির বিপরীতে বীমা পলিসিহোল্ডারদের বড় অংকের বীমা দাবি পরিশোধ করতে হলে কোম্পানি যেমন লোকসান করতে পারে। আবার কম দাবি পরিশোধ করতে হলে তাদের বড় মুনাফাও হতে পারে। তবে গাণিতিক হিসাব-নিকাশ যখন বীমা ঝুঁকির মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে সীমিত রাখে, তখন শেয়ারহোল্ডারেরও (বীমা কোম্পানির মালিকদের) কিছু লভ্যাংশ পাওয়ার থাকে।

বীমা খাতের কোম্পানিগুলোর আর্থিক বিবরণীও অন্যান্য সেবা বা ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির মতো সরল নয়, বিশেষ করে জীবন বীমায়। অ্যাকচুয়ারিয়াল ভ্যালুয়েশন জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর হিসাব-নিকাশকে আরো জটিল করে। এ কারণে বীমা খাতের কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেন না অনেকে। তবে মৌলভিত্তি ও বাজারের গতিপ্রকৃতি বুঝে বিনিয়োগ করতে পারলে এগুলো থেকেও ভাল মুনাফার সুযোগ আসতে পারে। তবে এজন্য বীমা কোম্পানির সম্পদ বৃদ্ধি ও প্রফিটিবিলিটির সঙ্গে সম্পর্কিত মূল ধারণাগুলো বিনিয়োগকারীর কাছে পরিষ্কার থাকতে হবে।

দেশে ৪৮টি নন-লাইফ এবং ৩০টি লাইফ বীমা কোম্পানিসহ মোট ৭৮টি বীমা কোম্পানি আছে। েযার মধ্যে ১২ টি লাইফ, ৩৫ টি নন-লাইফ মিলিয়ে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে ৪৭টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত আছে। বীমা কোম্পানিগুলোর মূল নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ ।

প্রথমেই লাইফ ও নন-লাইফ বীমার মধ্যে দুয়ের মিল ও পার্থক্যগুলো জানতে ও বুঝতে হবে। তাদের ব্যবসা, আয়-ব্যয়ের খাত, মুনাফার উৎস ও রিপোর্টিংয়ের ধরন সম্পর্কে মৌলিক ধারণাগুলো থাকলে সেকেন্ডারি বাজারে কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দর দেখে তাদের প্রকৃত মূল্য (ভ্যালুয়েশন মূল্য) সম্পর্কে বিভ্রান্ত হতে হবে না।

উভয় ক্ষেত্রেই  গ্রাহকের কাছ থেকে কিছু প্রিমিয়াম বিনিময়ে বীমা কোম্পানিগুলো অন্যের ঝুঁকি নিজের কাঁধে তুলে নেয়। যেখানে লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি মানুষের জীবনের বীমা সুবিধা দেয়, সেখানে  নন-লাইফ কোম্পানিগুলো বিভিন্ন ধরনের সম্পদের বিপরীতে বীমা সুবিধা দেয়।

উভয় ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে ঝুঁকির সমান্তরালে প্রিমিয়ামের অংকটি বাড়ে বা কমে। নন-লাইফের ক্ষেত্রে প্রিমিয়ামের অর্থ অফেরতযোগ্য, যেখানে জীবন বীমা কোম্পানিগুলো পলিসির মেয়াদপূর্তিতে তা সুদাসলে বোনাসসহ ফেরত দেয়। সম্ভাব্য ঝুঁকির হিসাব কষে প্রিমিয়াম নির্ধারণ, পরিচালন দক্ষতা নিশ্চিত করে গ্রাহককে বীমা সুবিধা দেয়া এবং প্রাপ্ত প্রিমিয়ামের অর্থ সদ্ব্যবহারের মধ্যেই কোম্পানির ব্যবসা (অায়) নিহিত।

সফল কোম্পানিগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সম্পদের ভিত্তি ও মান বাড়ায় এবং বেশি ঝুঁকি নেয়ার সক্ষমতা অর্জন করে, শেয়ারহোল্ডারদেরও ভালো লভ্যাংশ দিতে পারে। আর লোকসান করলে নন-লাইফ কোম্পানির ক্ষেত্রে শুধুমাত্র শেয়ারহোল্ডার অার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ক্ষেত্রে পলিসিহোল্ডার (যারা বীমা পলিসি প্রিমিয়ামের বিনিময়ে ক্রয় করেছে, তবে কোম্পানির মালিকানার সাথে তাদের সম্পর্ক  নাই) শেয়ারহোল্ডার উভয়পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

নন-লাইফ বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ তুলনামূলক সহজ। ম্যানুফ্যাকচারিং ও প্রচলিত অন্যান্য সেবার কোম্পানির মতোই তাদেরও আয়-ব্যয়, ব্যালান্স শিট ও ক্যাশ ফ্লো পাওয়া যায়। শেয়ারপ্রতি আয়, সম্পদমূল্য এগুলোও নন-লাইফ কোম্পানির ভ্যালুয়েশনকে সহজ করে।

তবে জীবন বীমা কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ তুলনামূলকভাবে কঠিন। তাদের ব্যবসার রিপোর্টিং নন-লাইফের মতো সরল নয়। জীবন বীমা কোম্পানিগুলো তুলনামূলক দীর্ঘমেয়াদের জন্য ফেরতযোগ্য প্রিমিয়াম নেয়। এটি অনেকটা এফডিআর সংগ্রহ করার মতো। তবে এফডিআর সংগ্রহকারী ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ে তাদের কর্মকাণ্ড ও ঝুঁকি তুলনামূলক জটিল।

জীবন বীমা কোম্পানিগুলোকে লাভ করতে হলে ব্যবস্থাপনা  ব্যয়, এজেন্সি কস্ট, পুনর্বীমার প্রিমিয়াম ও পরিশোধিত বীমা দাবি (বীমা পলিসিহোল্ডারদের পাওনা) মিটিয়ে লাভ করতে হয়।

একটি ব্যাংক বা এনবিএফআই এফডিআরের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ তুলনামূলক বেশি সুদের বিনিময়ে অন্যকে ধার দেয়।  দুই সুদের পার্থক্যটি তাদের আয়। জীবন বীমা কোম্পানি এই একই অর্থ ঋণ আকারে বিতরণ না করে বিভিন্ন লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করে একটি পোর্টফোলিও গঠন করে। সে পোর্টফোলিওর সম্পদমূল্যই কোম্পানির লাইফ ফান্ড। এখান থেকেই কোম্পানি তাদের পলিসিহোল্ডারের বীমা দাবি পরিশোধ করে।

লাইফ ফান্ডের সবটা শেয়ারহোল্ডারের নয়: সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অনেকেই ভুলে যান যে, জীবন বীমা কোম্পানির লাইফ ফান্ডের ৯০ শতাংশের মালিক কোম্পানির পলিসিহোল্ডাররা। বাকি মাত্র ১০ শতাংশের মালিক কোম্পানি বা শেয়ারহোল্ডাররা। একটি তালিকাভুক্ত জীবন বীমা কোম্পানির শেয়ারপ্রতি লাইফ ফান্ড যদি ৩০০ টাকা হয়, সেখানে শেয়ারহোল্ডারের অংশ (মালিক) বেশি হলে ৩০ টাকা। এটিকে মোটা দাগে জীবন বীমা কোম্পানির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) বলা যায়।

এখন জীবন বীমা কোম্পানির এ কল্পিত এনএভিপিএসকে রেফারেন্স ধরে কোম্পানিগুলোর শেয়ারের ভ্যালুয়েশনের একটি ভিত্তি দাঁড় করানো সম্ভব। তবে এটিকে আক্ষরিক অর্থে ভিত্তি ধরে নেয়াও পুরোপুরি যুক্তিযুক্ত হবে না। কারণ এ তহবিলের গুণগত মান ও রেভিনিউ জেনারেট করার সক্ষমতাও বিবেচ্য বিষয়।

মোট দাগে লাইফ ফান্ডের আকার কত বাড়ছে বা কমছে, সেটি দেখার পরিবর্তে বিনিয়োগকারীদের দেখতে হবে, লাইফ ফান্ড গ্রোথের কতটা নতুন পলিসির প্রিমিয়াম থেকে আসছে, আর কতটা পুরনো সম্পদের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আসছে। নতুন পলিসির প্রিমিয়ামের অবদান বেশি হলে বুঝতে হবে কোম্পানিটির ব্যবসা প্রবৃদ্ধি ভালো। আর পুরনো তহবিলের প্রবৃদ্ধি কোম্পানির বিনিয়োগ দক্ষতার পরিমাপক মানে কোম্পানিটি দক্ষতার সাথে পোর্টফোলিও গঠন ও ম্যানেজ করছে।

একজন দক্ষ ব্যবস্থাপকের হাতে বিনিয়োগকারীর ৩০ টাকা থাকা আর অদক্ষ হাতে একই পরিমাণ টাকার পার্থক্য আছে। মূলত এর ওপর নির্ভর করবে কোম্পানিটির শেয়ারের দর ৩০ টাকার উপরে থাকবে না নিচে থাকবে। প্রবৃদ্ধির ট্র্যাক রেকর্ড ও ব্যবসায়িক দক্ষতার বিষয়গুলোও ভ্যালুয়েশনের সময় যুক্ত হবে।

অ্যাকচুয়ারিয়ালভ্যালুয়েশন: জীবন বীমা কোম্পানিগুলোকে  অ্যাকচুয়ারিয়াল ভ্যালুয়েশন করতে হয়।অর্থনৈতিক ও জনমিতিক বাস্তবতাকে মাথায় রেখে পরিসংখ্যানগত পদ্ধতি প্রয়োগ করে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য দায় নির্ধারণই অ্যাকচুয়ারিয়াল ভ্যালুয়েশন।

দেশে বর্তমানে মাত্র তিনজন সনদপ্রাপ্ত অ্যাকচুয়ারি আছেন। তারা হচ্ছেন— এম শেফাক আহমেদ, জীবন বীমা করপোরেশনের বোর্ড চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসেন ও প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাফর হালিম।

অ্যাকচুয়ারিয়াল ভ্যালুয়েশন মূলত জীবন বীমা কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি ও দায় মূল্যায়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, প্রডাক্ট ডিজাইন, লাইফ ফান্ড, গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারের মুনাফা ও লভ্যাংশ নিরূপণ করে থাকেন।  জীবন বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে শেয়ারহোল্ডারের লভ্যাংশ প্রদানের পূর্বে অ্যাকচুয়ারিয়াল ভ্যালুয়েশন করাতে হয়। এই ভ্যালুয়েশনের মাধ্যমে কোম্পানি নিজেদের ব্যবসায়িক সবলতা ও দুর্বলতা নিরুপন করতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে ধরুন একটি জীবন বীমা কোম্পানি বিভিন্ন বয়সের ২০ হাজার মানুষকে জীবন বীমা সুবিধা দিয়ে ১০ বছরে ৮০০ কোটি টাকা প্রিমিয়াম আয় করল। এই ২০ হাজার মানুষই বীমা সুবিধার অধীনে থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে না। আবার কতজন মারা যাবে তাও বলা যাবে না। এক্ষেত্রে পরিসংখ্যান ও সম্ভাব্যতার গণিত কোম্পানিটিকে ভবিষ্যতে উদ্ভূত হতে পারে, এমন বীমা দাবির একটি সম্ভাব্য অংক নির্ধারণে সহায়তা করে।

অ্যাকচুয়ারি তাকে বলে দেন, বিশেষ কোনো পরিস্থিতি উদ্ভূত না হলে, লাইফ ফান্ডের এত শতাংশ কোম্পানির বীমা দাবি পরিশোধের জন্য বরাদ্দ রাখলেই চলবে। বাড়তি অর্থ কোম্পানি লভ্যাংশ আকারে শেয়ারহোল্ডারদের বা বোনাস আকারে প্রিমিয়ামদাতা পলিসিহোল্ডারদের মধ্যে বিতরণ করতে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো, বিশেষ পরিস্থিতিতে পরিসংখ্যানগত গড়ের চেয়ে বেশি বীমা দাবি পরিশোধ করার চাপ এলে বীমা কোম্পানি কী করবে? এর উত্তরেই আসে পুনর্বীমার ধারণা। পুনর্বীমার ধারণা পরিষ্কার বুঝতে হবে।

পুনর্বীমা: একজন বীমাকারী (বীমা কোম্পানি) গ্রাহকের কাছ থেকে নেয়া ঝুঁকিটি পুনর্বীমাকারীর কাঁধে তুলে দিতে পারেন। বীমা নিয়ন্ত্রকদের বেঁধে দেয়া আইন অনুসারে, কোম্পানিগুলো পুনর্বীমা করতে বাধ্য। এজন্য তাকে পুনর্বীমার প্রিমিয়াম দিতে হয়, যা সাধারণত গ্রাহকের কাছ থেকে নেয়া প্রিমিয়ামের চেয়ে কম হয়। পুনর্বীমা সাধারণত জেনারেল বীমা কোম্পানিগুলো তাদের ঝুঁকি হ্রাসের জন্য করে।

বিশ্বজুড়েই দেখা যায়, বড় কোনো দুর্যোগের পর বীমা দাবি পরিশোধের মূল চাপটি পড়ে পুনর্বীমা কোম্পানিগুলোর ওপর। আমাদের দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত পুনর্বীমাকারী শেয়াবাজারে তালিকাভুক্ত না হওয়ায় আপাতত পুনর্বীমাকারীর ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের কোনো দুশ্চিন্তার কো কারণ নেই।

মূল ব্যবসা  সম্পদ ব্যবস্থাপনা: যেকোনো খাতের শেয়ারে বিনিয়োগের আগেই মুখ্য বিবেচ্য হওয়া উচিত মূল ব্যবসা থেকে কোম্পানির রেভিনিউ ও মুনাফা অর্জনের সক্ষমতা। লাইফ, নন-লাইফ উভয় ক্যাটাগরির বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। বীমা খাতে কোন কোম্পানির ব্র্যান্ড ভ্যালু কেমন, গ্রাহকভিত্তি কত মজবুত, ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক কত ভালো, ব্যবস্থাপনা কত দক্ষ— এর সবই এখানে আলোচ্য বিষয়।

আবার বীমা কোম্পানি যেহেতু প্রিমিয়ামের টাকা অন্যদের ঋণ প্রদানে ব্যবহার না করে লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করে, সেহেতু শুধু মূল ব্যবসা পর্যালোচনা করাই যথেষ্ট নয়। তাদের বিনিয়োগ পোর্টফোলিওর মানও গুরুত্বপূর্ণ।

তাত্ত্বিকভাবে জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারের ধারণাটি তুলনামূলক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য কোম্পানিগুলোর পোর্টফোলিওর মান পর্যালোচনা করতে হয়। একটি কোম্পানি এফডিআর, বন্ড, শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ড, বীমা নিয়ন্ত্রকদের অনুমোদনক্রমে স্থাবর সম্পদে বিনিয়োগ করতে পারে। পোর্টফোলিওর একটি অংশ নগদেও রাখে।

২০১৮ সালে বিনিয়োগ করা ৩ হাজার কোটি টাকার পোর্টফোলিও মান আর ২০১৭-১৮ সালে বিনিয়োগ করা ৩ হাজার কোটি টাকার পোর্টফোলিওর মান ও সম্ভাব্য রিটার্ন যেহেতু আলাদা, সেহেতু বীমা কোম্পানির শেয়ার ধারণ করতে চাইলে এর খুঁটিনাটিগুলো বিশ্লেষণ করতেই হবে। নতুবা মোটা দাগের ভ্যালুয়েশনে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।

ব্যবস্থাপনা খাতে ব্যয়: জীবনবীমা কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি সাধারণবীমা কোম্পানিগুলোও বছরের পর বছর ব্যবস্থাপনা খাতে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় করছে বলে অভিযোগ আছে।

বীমাশিল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জীবনবীমা কোম্পানির ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ করা হয় ১৯৫৮ সালের বীমা বিধির ৩৯ ধারা অনুযায়ী। এ ধারায় বীমা ব্যবসার অনুমতি পাওয়ার পর একটি কোম্পানি তিন বছর পর্যন্ত প্রথম বর্ষ প্রিমিয়াম আয়ের সাড়ে ৯৭ শতাংশ এবং নবায়ন প্রিমিয়াম আয়ের সাড়ে ২২ শতাংশ পর্যন্ত খরচ করতে পারে।

ব্যবস্থাপনা ব্যয় বলতে পলিসিহোল্ডারের ক্লেম ছাড়া সব ধরনের ব্যয়কে বোঝায়। এর মধ্যে রয়েছে কমিশন, স্টাফদের বেতন, যাতায়াত, অফিস ভাড়া ইত্যাদি।  প্রিমিয়াম আয় ব্যাপক হারে কমে গেলে, নতুন বীমা কোম্পানি বাজারে আসলে বীমা কোম্পানিগুলোর প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পায়। প্রিমিয়াম (আয়) কমে কিন্তু ব্যয় অব্যাহত থাকে।

জীবন বীমার পলিসি বিক্রয় কখন বাড়ে : লাইফ ইন্স্যুরেন্স করার ক্ষেত্রে মুনাফা চিন্তার থেকে পারিবারিক ও   ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক ঝুঁকি কমানোর বিষয়টি বেশি বিবেচনা নেওয়া হয়। আমাদের দেশে অনেকে সঞ্চয় এবং অবসরকালীন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে লাইফ ইন্স্যুরেন্স পলিসি ক্রয় করে। অনেক সময়ে একজন পলিসিগ্রাহক পলিসির মেয়াদপূর্তি কর্মক্ষম প্রায় হারিয়ে ফেলেন বা বৃদ্ধ।

জীবন বীমা পলিসি দীর্ঘ মেয়াদী (দশ বা পনেরো বছর) হয়। মুদ্রাস্ফীতির জন্য একজন পলিসি গ্রাহক যে প্রিমিয়াম মুদ্রার প্রকৃত ক্রয় ক্ষমতা বিবেচনায় মেয়াদপুর্তিতে তার থেকে কম টাকাই পান, তবুও ঝুঁকি কথা বিবেচনায় মানুষ  লাইফ ইন্স্যুরেন্স পলিসি ক্রয় করে।

লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সাথে দেশের মানুষের সচেতনতা ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন জড়িত। দূর্ঘটনা জনিত আঘাত বা অকাল মৃত্যুর জন্য উন্নত দেশে লাইফ ইন্স্যুরেন্স জনপ্রিয়তা অাছে। তাছাড়া চিকিৎসা সেবা  সাথেও লাইফ ইন্স্যুরেন্স জড়িত। আমাদের দেশে অবশ্য অনেকে সঞ্চয়ের জন্যও অনেকে লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পলিসি ক্রয় করেন। স্বচ্ছতা,সচেতনতা, জবাবদিহি বৃদ্ধির মাধ্যমে এই খাততে প্রবৃদ্ধি সম্ভব। উন্নত অনেক দেশে লাইফ ইন্স্যুরেন্সে পলিসি ক্রয় অাইনগতভাবে বাদ্ধতামূলক হলেও আমাদের দেশে বাদ্ধতামূলক নয়।

আমাদের দেশে লাইফ ইন্স্যুরেন্সে কোম্পানির লাইফ ফান্ডের বাড়ার ক্ষেত্রে সূদের হারের সাথে কিছুটা সম্পর্ক  আছে। কারন তারা তাদের প্রিমিয়াম অায়ের একটি অংশ ব্যাংকে এফডিয়ার করে এবং ট্যাক্স রিবেট নেয়।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে ১২টি লাইফ  বীমা কোম্পানি তালিকাভূক্ত। ১. ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লি. ২. ফারিস্ট ইসলামী লাইফ ইন্সুরেন্স লি. ৩. মেঘনা লাইফ ইন্সুরেন্স কো. লি. ৪. ন্যাশনাল লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানি লি. ৫. পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লি. ৬. পপুলার  লাইফ ইন্স্যুরেন্স কো. লি. ৭. প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স লি. ৮. প্রাইম ইসলামি লাইফ ইন্স্যুরেন্স লি. ৯. রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লি. ১০. সানলাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লি. ১১. সন্ধানী লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানি লি. ১২. সানলাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লি.

সাধারণ বীমার পলিসি বিক্রয় কখন বাড়ে : দেশের আমদানি রপ্তানি সাথে সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোর সরাসরি সম্পৃক্ততা আছে। বৈদেশিক পণ্য আমদানি, রপ্তানির ক্ষেত্রে বীমা বাধ্যতামূলক। এছাড়াও শিল্প কারখানা ও সকল প্রকার ভারী যানবহনের জন্য অাইনগতভাবে বীমা করা বাদ্ধতামূলক। দেশে ব্যবসা বানিজ্য চাঙ্গা হলে সাধারণ বীমার ব্যবসা বাড়ে।

imranhoshen71@gmail.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here