‘বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারের তারল্য সংকট দূর করবে’

স্টাফ রিপোর্টার : দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগের বিষয়ে নমনীয় হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শিথিল করা হয়েছে বিনিয়োগের শর্ত। এখন থেকে পুঁজিবাজারের বাইরে থাকা কোম্পানির (Non-listed) সাধারণ শেয়ার, সাধারণ শেয়ারে রূপান্তরযোগ্য নয় এমন প্রেফারেন্স শেয়ার, শেয়ারে রূপান্তরযোগ্য নয় এমন বন্ড, ডিবেঞ্চার ও বে-মেয়াদী মিউচুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগকে ব্যাংকের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ হিসেবে হিসাবায়ন করা হবে না। বৃহস্পতিবার, ১৬ মে এই বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি কর্তৃক পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ সংক্রান্ত নীতিমালা শিরোনামের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সরকারসহ বিভিন্ন অংশীজনের মতামত এবং পুঁজিবাজারের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তালিকাভুক্ত নয় এরূপ সিকিউরিটিজে (Equity Share, Non-convertible Cumulative Preference Share, Non-Convertible Bond, Debenture, Open-end Mutual Fund) ব্যাংকের বিনিয়োগ পুঁজিবাজারে ব্যাংকের মোট বিনিয়োগ (Solo ও Consolidated) হিসাবায়নে অন্তর্ভূক্ত না করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা। তারা মনে করেন, এই সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারের জন্য খুবই ইতিবাচকভূমিকা রাখবে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংকগুলো এখনই বিনিয়োগ শুরু করবে এমন হয়তো নয়; কিন্তু বিনিয়োগ করার মতো সুযোগ তৈর হয়ে থাকছে তাদের জন্য।

মোঃ রকিবুর রহমান, সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান পরিচালক, ডিএসই

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান পরিচালক মোঃ রকিবুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নতুন সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারে তারল্য সংকট দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, শিল্পায়ন, নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আমাদের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার আরও বাড়ানোর জন্য একটি গতিশীল পুঁজিবাজার খুবই জরুরী। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ইতিবাচক ভূমিকা শুধু পুঁজিবাজার নয়, দেশের অর্থনীতিকেই আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করবে। তিনি এই উদ্যোগের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, বিএসইসির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

মোঃ শাকিল রিজভী, প্রেসিডেন্ট, ডিএসই ব্রোকারর্স অ্যাসোসিয়েশন

ডিএসই ব্রোকারর্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোঃ শাকিল রিজভী অর্থসূচককে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত খুবই ইতিবাচক। এটি আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি। এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়বে। তারা চাইলে বাজারে বিনিয়োগ বাড়াতে পারবে। বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

মোঃ ছায়েদুর রহমান, পরিচালক, সিএসই

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) পরিচালক ও বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়শনের সাবেক সভাপতি মোঃ ছায়েদুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত খুবই তাৎপর্যময়। এই সিদ্ধান্তে এটা স্পষ্ট হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক পুঁজিবাজারের প্রতি আন্তরিক। তাদের এই ইতিবাচক অবস্থান বিনিয়োগকারীসহ অন্যাণ্য স্টেকহোল্ডারের আস্থা বাড়াবে। বিষয়টি পুঁজিবাজারের বিকাশ ও গতিশীলতায় সাহায্য করবে।

খায়রুল বাশার আবু তাহের মোহাম্মদ, সাধারণ সম্পাদক, বিএমবিএ

বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সাধারণ সম্পাদক ও এমটিবি ক্যাপিটালের সিইও খায়রুল বাশার আবু তাহের মোহাম্মদ বলেন, তালিকার বাইরে থাকা সিকিউরিটজকে এক্সপোজারের বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত ব্যাংকের বিনিয়োগসক্ষমতা বাড়াবে। বাজারে বিদ্যমান তারল্য সংকট তাতে অনেকটাই কেটে যাবে।

তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংকগুলো তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানে (বেশিরভাগই ব্রোকারহাউজ অথবা মার্চেন্ট ব্যাংক) নতুন মূলধনের যোগান দিতে পারবে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়বে।

নতুন সিদ্ধান্ত বে-মেয়াদী মিউচুয়াল ফান্ডে নতুন গতি সঞ্চার করবে। এতদিন অ্যাসেট ম্যানেজাররা এ ধরনের ফান্ডের জন্য সহজে উদ্যোক্তা (Sponsor) খুঁজে পেতেন না। এক্সপোজার সংক্রান্ত জটিলতায় ব্যাংকগুলো দূরে থাকতো। এখন এই সমস্যা অনেকটাই কেটে যাবে।

তিনি আরও বলেন, নতুন সিদ্ধান্তে ব্যাংকগুলোর জন্য একটা জায়গা তৈরি হয়েছে। তালিকা-বহির্ভূত কোম্পানিতে বর্তমানে যে বিনিয়োগ আছে, সেগুলো ফ্রি হয়ে যাবে। অন্যদিকে আগামী দিনেও তারা এ ধরনের কোম্পানিতে যে বিনিয়োগ করবে, তা এক্সপোজারে কোনো প্রভাব ফেলবে না। তাই নন-লিস্টেড সিকিউরিটিজের বিনিয়োগ ব্যাংকগুলোর পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ সক্ষমতাকে সংকুচিত করবে না।

মাহবুব হোসেন মজুমদার, নির্বাহী সদস্য, বিএমবিএ

বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) নির্বাহী কমিটির সদস্য ও এএফসি ক্যাপিটালের সিইও মাহবুব হোসেন মজুমদার অর্থসূচককে বলেন, এটি আমাদের অনেক দিনের প্রত্যাশিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ইতিবাচক ভূমিকা দেশের পুঁজিবাজারের বিকাশে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে।

এমরান হাসান, সিইও, শান্তা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট

সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান শান্তা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এমরান হাসান অর্থসূচককে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারে যুগান্তকারী হয়ে থাকবে। এটি বে-মেয়াদী মিউচুয়াল ফান্ডের (Open-end) বিকাশকে ত্বরান্বিত করবে, পরোক্ষভাবে যা পুঁজিবাজারকেই শক্তিশালী করবে। তিনি বলেন, ভারতসহ উন্নত দেশগুলোতে ওপেন-ইন্ড মিউচুয়াল ফান্ডের মোট আকার ক্লোজ-ইন্ড ফান্ডের কয়েকগুণ। অন্যদিকে বাংলাদেশে তা ক্লোজ-ইন্ড ফান্ডের ১৭ শতাংশের মত। আইনী সীমাবদ্ধতার কারণে এতদিন ব্যাংকগুলো চাইলেও ওপেন-ইন্ড ফান্ডে তেমন বিনিয়োগ করতে পারতো না। আজকের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সে বাধা দূর হয়ে গেল।

তিনি বলেন, মিউচুয়াল ফান্ডগুলো তাদের তহবিলের বড় অংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে থাকে। তাই এই শিল্পের সক্ষমতা যত বাড়তে, তারা পুঁজিবাজারে তত বেশী বিনিয়োগ করতে পারবে।

অন্যান্য স্টেকহোল্ডারও বাংলাদেশ ব্যাংকের এ যুগান্তকারী সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে বিনিয়োগকারী ঐক্য ফোরামের সভাপতি মিজানুর রহমান চৌধুরী গভর্নরসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here