কারসাজি না হলে দাম বাড়বে না

দেশে চলতি বছর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি বেড়েছে। পাশাপাশি পণ্যগুলোর আন্তর্জাতিক বাজারদরও পড়তির দিকে। ফলে আগামী পবিত্র রমজান মাসে বাড়তি চাহিদা তৈরি হলেও মূল্যবৃদ্ধির কোনো কারণ নেই। অবশ্য অতীতের অভিজ্ঞতায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নানা কারসাজি করে রোজায় কয়েকটি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন ব্যবসায়ীরা। এবার যাতে তা না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন (বিটিসি) গত সপ্তাহে ভোজ্যতেল, চিনি, মসুর ডাল, ছোলা, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি, আন্তর্জাতিক বাজারদর ও দেশের বাজারদরের পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এতে দেখা যায়, দেশের চাহিদার তুলনায় এসব পণ্যের আমদানি স্বাভাবিক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমদানি বেশি।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানিকারকেরাও বলছেন, গত রোজার চেয়ে এ বছর পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কম। তবে তাঁদের চিন্তা ডলারের দাম, ব্যাংকের ঋণের সুদের হার ও চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্যজট নিয়ে। উল্লেখ্য, সম্প্রতি আমদানি অনেক বেড়ে যাওয়ায় ডলারের সরবরাহে টান পড়েছে। এতে টাকার বিপরীতে মার্কিন এই মুদ্রার দাম বেড়েছে। তা ছাড়া তারল্যসংকট তৈরি হওয়ায় ঋণ ও আমানতের সুদের হার বাড়িয়ে দিয়েছে ব্যাংকগুলো। আমদানি-রপ্তানির চাপে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে সময় বেশি লাগছে। বন্দরে জটের কারণে জাহাজ জেটিতে ভিড়তে দীর্ঘ সময় লাগছে। এতে পণ্যের আমদানি খরচ বাড়ছে। পাশাপাশি সময়মতো পণ্য হাতে পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা, যা সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বড় আমদানিকারক বলেন, ব্যাংকে ডলারের সরবরাহ পর্যাপ্ত নয়। আবার ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১২-১৩ শতাংশ করা হয়েছে। বন্দরে জটের কারণে পণ্য খালাসে বিলম্ব হয়। সরকারের উচিত এসব বিষয়ে নজর দেওয়া।

ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনটি গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। সূত্র জানায়, সেখানে দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। উল্লেখ্য, ট্যারিফ কমিশন রয়টার্স, বাংলাদেশ ব্যাংক ও ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে।

ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে বছরে প্রায় ১৬ লাখ টন চিনির চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে এক লাখ টনের মতো দেশে উৎপাদিত হয়। গত জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে দেশে চিনি আমদানি হয়েছে ১৫ লাখ ৬৩ হাজার টন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) গত বছরের একই সময়ের আমদানি তথ্য তুলনা করলে দেখা যায়, এ বছর চিনি আমদানির পরিমাণ ১৭ শতাংশ বেশি। ট্যারিফ কমিশন বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক মাসে অপরিশোধিত চিনির দাম ৪ শতাংশ ও এক বছরে ২৫ শতাংশ কমেছে।

ট্যারিফ কমিশনের হিসাবে দেশে বছরে এখন ১৫ লাখ টন পরিশোধিত ভোজ্যতেলের চাহিদা আছে। দেশে সরষেসহ প্রায় ২ লাখ টন ভোজ্যতেল উৎপাদিত হয়। বাকিটা আমদানি করা হয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ১২ লাখ ৭১ হাজার টন পরিশোধিত ও অপরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫ লাখ টন সয়াবিন তেল। বাকিটা পাম তেল। ফলে দেখা যাচ্ছে, দেশের মোট চাহিদার সিংহভাগ ভোজ্যতেল আট মাসেই আমদানি হয়েছে। অবশ্য গত বছরের তুলনায় এ বছর আমদানি কিছুটা কম। গত বছর আলোচ্য সময়ে ১৩ লাখ ৮১ হাজার টন ভোজ্যতেল দেশে এসেছিল বলে দেখা যায় এনবিআরের হিসাবে।

রোজায় বাজারের পরিস্থিতি কী দাঁড়াতে পারে জানতে চাইলে মেঘনা গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক (বিপণন) আসিফ ইকবাল প্রথম আলোকে বলেন, সাধারণত চাহিদা ও জোগানে ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক বাজারদর স্থিতিশীল থাকলে মূল্যে প্রভাব পড়ে না।

আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দর পড়তি। গত এক বছরে অপরিশোধিত পাম তেলের দাম ১৪ শতাংশ কমেছে। এক মাসে কমেছে ৩ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে সয়াবিন তেলের বাজারে তেমন হেরফের হয়নি। এক মাসে পণ্যটির দর সামান্য কিছুটা কমেছে। ট্যারিফ কমিশন বলছে, আমদানি অব্যাহত থাকলে রমজান মাসে ভোজ্যতেলের দাম ও সরবরাহ স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করা যায়।

আন্তর্জাতিক বাজারে ছোলার দাম কমেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের হিসাবে, ১২ মার্চ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি কেজি ছোলার দাম ছিল ৫১ টাকা ২২ পয়সা, যা এক মাস আগের তুলনায় ২ শতাংশের মতো কম। ট্যারিফ কমিশনের হিসাবে দেশে বছরে আস্ত ছোলার চাহিদা ১ লাখ টন। এর মধ্যে রোজাকেন্দ্রিক বাজারে ৮০ হাজার টনের মতো বিক্রি হয়। মসুর ডালের আন্তর্জাতিক বাজারদর এক বছর ধরে নিম্ন পর্যায়ে আছে। ফলে বাজারে ডালের দাম আগের বছরের তুলনায় কম। ট্যারিফ কমিশনের হিসাবে, গত আট মাসে ১ লাখ ৪ হাজার টন মসুর ডাল আমদানি হয়েছে।

ডালের বাজার নিয়ে চট্টগ্রামের বড় আমদানিকারক বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, গত বছরের চেয়ে এ বছর ছোলা ও মসুর ডালের আন্তর্জাতিক বাজার কেজিতে ১০-১৫ টাকা কম। আশা করা যায়, দেশের মানুষ আগের চেয়ে কম দামে মসুর ডাল ও ছোলা কিনতে পারবে।

পেঁয়াজের বাজারদরও পড়তি। এক মাসে পণ্যটির দাম কমেছে প্রায় ৯ শতাংশ। এদিকে দেশে নতুন মৌসুমে সংরক্ষণ করে রাখার মতো হালি পেঁয়াজ বাজারে আসতে শুরু করেছে। ফলে ভরা মৌসুমে পণ্যটির দাম স্থিতিশীল থাকার আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।

ট্যারিফ কমিশনের হিসাবে দেশে বছরে খেজুরের চাহিদা ২০ হাজার টন। এর মধ্যে ১৮ হাজার টনই লাগে রোজায়। চলতি অর্থবছরের আট মাসে দেশে ২০ হাজার টন খেজুর আমদানি হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, রোজা এলে ব্যবসায়ীরা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে চান। দুই বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, রোজার আগে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কারখানা বন্ধ হয়ে চিনির সরবরাহে প্রভাব পড়ে। এতে দাম বেড়ে যায়। এবারও ত্রুটির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি বলেন, সরকারকে বাজারে নজর রাখতে হবে। পাশাপাশি পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহের হিসাব যাতে সঠিক হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here