কমছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ

স্টাফ রিপোর্টার : স্বাধীনতার পর শূন্য হাতে শুরু করে এক সময় ৩৩ বিলিয়ন (তিন হাজার ৩০০ কোটি) ডলার ছাড়ায় বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ। এই উত্থান বেশিদিন আগের নয়। ২০১১-১২ অর্থবছরেও রিজার্ভ ছিল ১০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে। আর ২০০১ সালে রিজার্ভ এক বিলিয়নেরও কম ছিল, যে কারণে একবার বৈদেশিক লেনদেনের দায় দেরিতে পরিশোধ করতে হয়েছিল।

এমন দুঃসময় পেরিয়ে গত ছয় অর্থবছরে রিজার্ভে অভাবনীয় উল্লম্ফন দেখা দিলেও গত দুই-আড়াই বছর ধরে ৩১-৩২ বিলিয়ন ডলারের ঘরে ওঠানামা করতে থাকে। সর্বশেষ গত সপ্তাহে সেই রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৮ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়ায় ৩০ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলারে। ২০১৮ সালের ৮ মে রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার।

না গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ প্রথম ৩৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায় ২০১৭ সালে ২২ জুন। প্রতি মাসে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার আমদানি খরচ হিসাবে ওই রিজার্ভ দিয়ে ৯ মাসের বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব ছিল।

রিজার্ভ এক বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এলে ভাবমূর্তি নষ্ট হবে বলে ২০০১ সালে প্রথমবারের মতো এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) আমদানি বিল বকেয়া রাখতে বাধ্য হয়েছিল বাংলাদেশ। ১৭ বছরের মাথায় সেই রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায় এবং ২০১৭ সালের আগস্টে রিজার্ভ বেড়ে সর্বোচ্চ ৩৩ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারে অবস্থান করে। এরপর অবশ্য আর কখনও রিজার্ভ এমন উচ্চতা পায়নি। কয়েক দফা ওঠানামার পর সর্বশেষ রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে এসেছে।
বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়া এবং রমজানে পণ্য আমদানিতে খোলা এলসির (ঋণপত্র) দেনা পরিশোধের জন্য সম্প্রতি ব্যাংকগুলোর বাড়তি ডলারের প্রয়োজন দেখা দেয়। গত কয়েক মাস ধরে ডলার বিক্রি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক কাজী ছাইদুর রহমান জানান, চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের এ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর কাছে ২১৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের পুরো সময়ে ব্যাংকগুলোর কাছে ২৩১ কোটি ডলার বিক্রি করে সংস্থাটি। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরে ডলার বিক্রির প্রবণতাও বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, বৈদেশিক লেনদেনে বাংলাদেশ ঘাটতিতে পড়ায় বর্তমানে রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। তবে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভের প্রধান উৎস রফতানি আয় ও রেমিট্যান্সে তুলনামূলক ভালো প্রবৃদ্ধি থাকায় চাপ ততটা প্রকট হতে পারছে না।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) তিন হাজার ৩৯৩ কোটি ৭৩ লাখ (৩৩ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে। রফতানির এই অঙ্ক ২০১৭-১৮ অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১১ দশমিক ৬১ শতাংশ বেশি। আর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ছয় দশমিক ৩৬ শতাংশ বেশি।

তাছাড়া অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) রেমিট্যান্স এসেছে এক হাজার ৩৩০ কোটি ৩০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রেমিট্যান্স বেড়েছে ১০ শতাংশ। অন্যদিকে, অর্থবছরের ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) সময়ে আমদানি ব্যয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র পাঁচ দশমিক ১৩ শতাংশ। আলোচ্য ৯ মাসে আমদানি ব্যয় হয়েছে চার হাজার ২৩৬ কোটি ডলার।

বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্য সারণির তথ্যমতে, অর্থবছরের ৯ মাসে পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক হাজার ১৯২ কোটি ৮০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি ছিল এক হাজার ৩১৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার। চলতি হিসাবে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪২৩ কোটি ডলার। সামগ্রিক হিসাবে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩২ কোটি ৯০ লাখ ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, বৈদেশিক লেনদেনের সামগ্রিক হিসাবে ঘাটতি থাকলে তা রিজার্ভ থেকে সমন্বয়ের মাধ্যমে ওই ঘাটতি পূরণ করতে হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here